ঋণের ২৭০০ কোটি টাকা শোধ করতে হবে না এক বছর

ঋণের ২৭০০ কোটি টাকা শোধ করতে হবে না এক বছর

তাজা খবর:

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্থবির দেশের অর্থনীতি। ঘুরছে না কারখানার চাকা। দোকানপাট, শপিং মল, বিপণিবিতান, বন্দর সব কিছু বন্ধ। এতে সরকারের আয়ে টান পড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ অর্থ বিতরণ, ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকারের অপ্রত্যাশিত ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। করোনার প্রভাবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহও কমে গেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র, মেট্রো রেলসহ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে এরই মধ্যে যেসব ঋণ নিয়েছে, সেসব ঋণের মূল টাকার পাশাপাশি সুদ পরিশোধেরও চাপ রয়েছে। চারদিকে যখন খরচ আর খরচের ফর্দ, এমন দুঃসময়ে সরকারের কাছে কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে গ্রুপ অব টোয়েন্টির (জি-২০) অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো থেকে। খবরটি হলো—মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার জি-২০ দেশগুলো থেকে আগে যেসব ঋণ নিয়েছে, করোনার চলমান বিপর্যয়ের কারণে আগামী এক বছর অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২০ থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ওই সব ঋণের মূল টাকা ও সুদ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে না। অর্থাৎ সুদ আর আসল মিলে যে টাকা পরিশোধ করার কথা সরকারের, তা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হবে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশ, নিম্ন আয় ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য এই ছাড় ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ গ্রুপ-২০-এর দেশগুলো। তবে এই সুযোগ গ্রহণ করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আবেদনের সঙ্গে কিছু শর্তও পূরণ করতে হবে। একাধিক অর্থনীতিবিদ কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, গ্রুপ-২০ দেশগুলো থেকে এক বছর ঋণ পরিশোধ মওকুফের যে সুযোগ বাংলাদেশের সামনে এসেছে তা গ্রহণ করা উচিত। কারণ এখনকার টাকার যে মূল্য, এক বছর পর টাকার সেই মূল্য না-ও থাকতে পারে। সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারের কাছে এখন এক টাকার অনেক মূল্য। তা ছাড়া করোনা সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তখন এই সুযোগটির সময়ও বাড়বে। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক জানিয়েছেন, সুযোগটি গ্রহণ করা হবে কি না তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য, গ্রুপ অব টোয়েন্টি হলো বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট। গ্রুপের সদস্য ১৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশ্বের মোট জাতীয় উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রিত হয় এসব দেশ থেকে।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের করা হিসাবে দেখা গেছে, উল্লিখিত সময়ে অর্থাৎ আগামী এক বছরে জি-২০ দেশগুলোর দেওয়া ঋণের মূল ও সুদ মিলিয়ে ৩১ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তির দেশ চীনকে ৯ কোটি ডলার বা ৭৬৫ কোটি টাকা, রাশিয়াকে ৯ কোটি ডলার বা ৭৬৫ কোটি টাকা, জাপানকে ৯ কোটি ডলার বা ৭৬৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া ভারতকে দেড় কোটি ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স ও জার্মানিকে ছোট ছোট অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। জি-২০ দেশগুলোর প্রস্তাব নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে তৈরি করা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে এখন চলমান সবচেয়ে বড় প্রকল্প হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, যা বাস্তবায়িত হচ্ছে রাশিয়ার ঋণে। এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পে প্রতিবছর নির্ধারিত হারে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। রাশিয়া জি-২০ ভুক্ত দেশ। আরেক জি-২০ ভুক্ত দেশ জাপানের অর্থায়নে চলমান আছে মেট্রো রেল, মাতারবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্প। চীনের অর্থায়নে চলছে পায়রা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি সড়কের প্রকল্প। বর্তমানে কভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে চলমান সাধারণ ছুটির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে আছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। এতেও সুদ গুনতে হবে সরকারকে। এ পরিস্থিতিতে এই সুদ ও মূল টাকা পরিশোধ এক বছরের জন্য মওকুফের ঘোষণা এলো জি-২০ দেশগুলো থেকে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার অতিরিক্ত সচিব আজিজুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জি-২০ দেশগুলোর ঋণ ছাড়ের প্রস্তাবটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। আমরা সুযোগটি নেব কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। কারণ এখানে একদিকে যেমন ইতিবাচক দিক আছে; তেমনি নেতিবাচক দিকও আছে।’ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৫ এপ্রিল জি-২০ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও গভর্নররা একটি ভার্চুয়াল সভায় অংশ নিয়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য এক বছরের ঋণ পরিশোধ ছাড়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তবে শুধু দ্বিপক্ষীয় ঋণ চুক্তিতে প্রযোজ্য হবে। বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, আইডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে এই ছাড় দেওয়া হয়নি। ফলে বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলোর ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে। ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অবশ্যই এই সুযোগ নেওয়া উচিত। কারণ করোনার প্রভাব যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে ঋণ পরিশোধ না করার সময় আরো বাড়বে। এখন সরকারের টাকার যেমন সংকট, দুই বছর পর পরিস্থিতি যখন উন্নতি হবে, তখন এখনকার মতো টাকার সংকট থাকবে না। আগামী এক বছর যে টাকা ঋণ পরিশোধে খরচ হতো, সেই টাকা দিয়ে করোনার প্রভাব মোকাবেলায় সরকার খরচ করতে পারবে। তা ছাড়া এখন যদি ঋণ পরিশোধ করা হয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। সরকারের এসব দিক বিবেচনা করা উচিত।’ যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, এখন হোক আর এক বছর পর হোক ঋণের টাকা তো পরিশোধ করতেই হবে। তা ছাড়া জি-২০ দেশগুলো কিছু শর্ত দিয়েছে। যার মধ্যে একটি হলো—আগামী এক বছর কোনো দেশ বা সংস্থা থেকে কঠিন শর্তে ঋণ নেওয়া যাবে না। এই শর্তটি পূরণ করতে গিয়ে হয়তো আরেক ঝামেলায় পড়তে হবে সরকারকে। আরো কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। সেসব শর্ত পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *