করের বোঝা চাপানো হচ্ছে না ॥ করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বস্তিদায়ক নীতি বাজেটে

করের বোঝা চাপানো হচ্ছে না ॥ করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বস্তিদায়ক নীতি বাজেটে

তাজা খবর:

করোনায় বিপর্যস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বাজেটে স্বস্তিদায়ক কর-ভ্যাট নীতি অবলম্বন করা হয়েছে। নাগরিকদের ওপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে না। বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতি মেটানো ও ব্যয় সামাল দিতে বিদেশী সহায়তা ও ঋণ গ্রহণ করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিড়ি ও সিগারেটের মতো জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ওপর কর ও ভ্যাট বাড়ানো, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া করোনার মতো ভাইরাসজনিত রোগবালাই মোকাবেলা ও সুচিকিৎসায় স্বাস্থ্য খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করার কর্মসূচী নেয়া হবে আসন্ন বাজেটে। এসব বিনিয়োগে সহজ শর্তের ঋণ ও দীর্ঘমেয়াদে কর অবকাশ সুবিধা প্রদান করা হবে। খাদ্যপণ্য আমদানি ও উৎপাদনে এবার কর ছাড় দেয়া হবে। করোনা সঙ্কট উত্তরণে গতানুগতিক পলিসি থেকে সরে এসে নীতিগত সহায়তা প্রদানের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

এদিকে, করোনা সঙ্কটের কারণে গত কয়েক মাসে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কর ছাড় দিতে হয়েছে এনবিআরকে। এলএনজি আমদানি, তৈরি পোশাক ও সরকারী প্রকল্পে বড় কর ছাড় দেয়া হয়েছে। চাল ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়েছে। ঢালাওভাবে কর ছাড় ও ব্যবসা মন্দার কারণে বাড়ছে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ দশমিক ০৫ শতাংশ রাজস্ব আহরণ কম পেয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। ফলে পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক নির্ভর হচ্ছে সরকার।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি আমদানি-সরবরাহ, তৈরি পোশাক ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর-ভ্যাটসহ বিভিন্ন করে চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড় দেয়া হয়। পাশাপাশি দেশে ব্যবসা মন্দার কারণে গাড়ি, সিমেন্টের ক্লিংকার, ক্যাপিটাল মেশিনারিসহ বৃহৎ শুল্কের পণ্য আমদানি কমে গেছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও রাজস্ব আহরণ কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না। এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যবসা সহজীকরণ ও সরকারের অনুরোধের কারণে চলতি অর্থবছরে এলএনজিতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা, তৈরি পোশাক শিল্পে উৎসে করে ২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকের কর্পোরেট করে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, পদ্মা সেতুসহ বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে কয়েক হাজার কোটি টাকার কর ছাড় দেয়া হয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ও ব্যবসায় মন্দার কথা জানিয়ে সিগারেটসহ কয়েকটি খাতের ব্যবসায়ীরা ভ্যাট কম দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। যার বিপরীতে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এটি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩১ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা কম।

এছাড়া আমদানির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ কমে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার অনেক পিছিয়ে ভ্যাট আহরণও। দ্বিতীয় সবচেয়ে বেশি ঘাটতি স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট খাতে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ দশমিক ০৩ শতাংশ ঘাটতিতে রয়েছে এনবিআর। প্রথম ছয় মাসে ৫১ হাজার ৯৯৬ কোটির স্থলে আদায় হয়েছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের সদস্য আব্দুল মান্নান শিকদার জানিয়েছেন, বছরের শুরুর দিকে সাধরণত ভ্যাট আহরণ কম হয়। তবে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন বসানো সম্পন্ন হলে ভ্যাট আহরণ বাড়বে। বছর শেষে এ খাতে ঘাটতি কমে আসবে।

এদিকে, উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের এখন পর্যন্ত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ব্যাংক নিয়েছে সরকার। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরেই এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঋণ নেয়া হয়ে গেছে ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগামী বাজেটে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট) হাবিবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার আলোকে সব সময় ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে থাকে সরকার। রাজস্ব আহরণ কাক্সিক্ষত না হলে খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে হয়। এদিকে, চলতি অর্থবছরে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ রয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি প্রাক্কলন করেছে। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ চলতি অর্থবছর থেকে ২৯ হাজার ৬২১ কোটি টাকা বেশি।

সাধারণত ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দুই খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক। অভ্যন্তরীণ খাত আবার দুই ভাগে ভাগ করা। এর একটি হলো ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া। আর অপরটি হলো সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নেয়া। আগামী অর্থবছরের বাজেটে দেশীয় খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ব্যাংক থেকে বেশিমাত্রায় ঋণ নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে। ব্যাংক থেকে সরকার ৭২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। আর আগামী বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এ উৎস থেকে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে বিদেশী উৎসের ওপর। আগামী বাজেটে বিদেশী উৎস থেকে সরকার ৭৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা পাওয়ার আশা করছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে ৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে।

জানা গেছে, আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। এনবিআরের মাধ্যমে আসন্ন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা একরকম অসম্ভব বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। রাজস্ব আদায় সফল করতে রাজস্ব খাতের প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার ও কর ফাঁকি রোধে দরকারি বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা। চলতি অর্থবছর ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল সরকার। পরে তা কমিয়ে ৩ লাখ ৬০০ কোটি টাকা করা হয়।

এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর জনকণ্ঠকে বলেন, টাকা শুধু চাইলে হবে না, তা সংগ্রহ করতে হবে। আর তার জন্য অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামগ্রিক পরিবেশটা ঠিক থাকতে হবে। এ বছর যে ট্যাক্সগুলো দেয়া হবে, সেটা ইনকাম ট্যাক্সের ক্ষেত্রে আগামী বছর কম হবে। এর মূল কারণ, ব্যাংকগুলো প্রফিট করেনি। অন্যান্য কর্পোরেট খাতের প্রফিট করার কোন সম্ভাবনা নেই। তারা লোকসান করছে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী বছর কোন বিবেচনায় ৩৬ শতাংশ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরছি সেটা আমার কাছে বোধগম্য নয়।

এদিকে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ভরসা করা হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর বা মূসক-এ। মূসক থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। আয়কর থেকে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, শুল্ক থেকে ৯৫ হাজার ২০ কোটি টাকা ও অন্যান্য খাত থেকে ১ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ৬৮ শতাংশই আশা করা হচ্ছে পরোক্ষ কর থেকে। এই অর্থবছরে যা ছিল ৬৫ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডির) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, অপ্রত্যক্ষ করের চাপ সাধারণ মানুষের ওপরেই বেশি পড়ে। এটা আদায় করা সহজ। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বিভিন্ন ব্যয় করতে হয়। সেই ব্যয়ের ওপর ট্যাক্স রাখা হলে সেটা আদায়ও অনেক সহজ হয়ে যায়। তিনি বলেন, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, কিভাবে কর ফাঁকি রোধ করা যায়। প্রত্যক্ষ কর যেটা দেয়ার কথা, সেটা ঠিকমতো আসছে কিনা সেটার কঠোর নজরদারি করা প্রয়োজন।

এদিকে, বেসরকারী খাতের বিনিয়োগ প্রবাহ ঠিক রাখতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ব্যাংক ঋণ কম নেয়া উচিত বলে মনে করেন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে সরকারের সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে বেশি ঋণ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে বেসরকারী খাত সহজে ঋণ নিতে পারবে। তবে বেসরকারী ব্যাংকগুলো সরকারকে বেশি ঋণ দিতে চায়। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ ঝুঁকি নেই, মুনাফাও বেশি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *