চাল উৎপাদনের টার্গেট ৩৫ লাখ টন ॥ আউশেও বাম্পার ফলনের আশা

চাল উৎপাদনের টার্গেট ৩৫ লাখ টন ॥ আউশেও বাম্পার ফলনের আশা

তাজা খবর:

বোরোতে রেকর্ড ধান উৎপাদনের পর এবার আউশের প্রতি নজর সরকারের। বোরোর মতো আউশ উৎপাদনেও বাম্পার ফলনের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ ধানটির ফলন বাড়াতে কৃষকদের প্রণোদনা প্রদানসহ পতিত জমি আউশ আবাদের আওতায় আনার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ বছর ১৩ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ আবাদের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই জমি থেকে আউশ চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন চাল। এ লক্ষ্য অর্জনে মাঠে কাজ করছে কৃষি কর্মকর্তারা। ফলে বোরোর মতো আউশেরও বাম্পার ফলন আশা করছেন কৃষি মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে তিন মৌসুমে ধানের চাষ করা হয়- আউশ, আমন ও বোরো মৌসুম। বোরো ধান চাষে প্রচুর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহৃত হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর দিনে দিনে নিচে নামছে যা কাক্সিক্ষত নয়। যেহেতু আউশ ধানের আবাদ বৃষ্টিনির্ভর, সেহেতু এ ধান উৎপাদনে সেচ খরচ সাশ্রয় হয়। ফলে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রচলিত শস্য পর্যায় পরিবর্তন করে বোরো ধানের চাষ বাদ দিয়ে শস্য পর্যায়ে আউশ ধান অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছে। চলতি আউশ মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এই প্রণোদনা কর্মসূচীর আওতায় সারাদেশে ৪ লাখ ৫০ হাজার বিঘা জমিতে চাষের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে (কৃষক প্রতি ১ বিঘা) বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ করা হয়েছে। এরমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যে দেশের মৌলভীবাজার জেলায় সবচেয়ে বেশি জমি পতিত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। তাই এই জমি চলতি মৌসুমেই আউশ ধান চাষের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে শুধু এ জেলার ৩ হাজার কৃষকের মাঝে ১৫ মেট্রিক টন আউশ বীজ বিনামূল্যে দেয়া হয়েছে।

প্রণোদনা ও কৃষিকর্মীদের সহযোগিতার কারণে এবছর আউশ আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২৪ জুন পর্যন্ত আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে ১০ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর।

গত দুই বছর ধরেই আউশের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এজন্য নেয়া হয়েছে নানামুখী উদ্যোগ। যার মধ্যে অন্যতম প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে আউশ বীজ ও সার বিতরণ। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিরলস পরিশ্রম এবং কৃষকদের মধ্যে আউশ আবাদের সুফল যথাযথভাবে তুলে ধরা। এ কারণে দেশে আউশের আবাদ ও উৎপাদন দুটোই বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে ৯ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছিল, সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টরে। পরের বছর ২০১৯-২০ অর্থবছরে আরও এক লাখ হেক্টর বেড়ে আউশ ধান আবাদ হয় ১১ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে। গত মৌসুমে (২০২০-২১) দেশের ১৩ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে আউশ আবাদ হয়েছিল। আর আউশ চাল উৎপাদিত হয়েছিল ৩৪ লাখ ৫১ হাজার টন। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি আউশ মৌসুমেও (২০২১-২২) ফসলি জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। আর এই জমি থেকে আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ লাখ ৮৫ হাজার টন।

আউশ আবাদে সেচ কম লাগে। সার ও পরিচর্যা খরচও কম। স্বল্প খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়। এই কথাগুলো মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে কাজ করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাঠকর্মীরা। ধান উৎপাদনে পরিচিত জেলাগুলোসহ সারাদেশে আউশ আবাদ জনপ্রিয় করতে কৃষকের কাছাকাছি কর্মকর্তাদের পৌঁছাতে তৎপর মন্ত্রণালয়।

আউশ মৌসুমকে সামনে রেখে বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে কৃষকদের সরকারী প্রণোদনা। প্রণোদনার মধ্যে থাকছে উচ্চ ফলনশীল জাতের আউশ বীজ, সার। আউশ আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ ও নিবিড় মনিটরিং। ফলে সেচসাশ্রয়ী আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া দিচ্ছেন কৃষকরা। যার সুফল পাচ্ছে পুরো দেশ।

আউশের আবাদ বাড়াতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সারাদেশের প্রান্তিক কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে। চলতি বছর আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে এ পর্যন্ত চার লাখ ৫০ হাজার প্রান্তিক কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ করেছে সরকার। এছাড়া মৌলভীবাজারের পতিত জমিও চাষের আওতায় আনতে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে তিন হাজার কৃষকের মাঝে ১৫ টনের বেশি আউশ বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা প্রণোদনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জানান, আউশ প্রণোদনা কর্মসূচীর আওতায় ৪ লাখ ৫০ হাজার বিঘা জমি চাষের জন্য ৪,৫০,০০০ কৃষককে প্রণোদনা দেয়া হয়। এ কর্মসূচীর আওতায় প্রতিজনকে এক বিঘা জমি চাষের জন্য বীজ ৫ কেজি (প্রতি কেজি ৬৫ টাকা দরে ৩২৫ টাকা), ডিএপি ২০ কেজি (প্রতি কেজি ১৪ টাকা দরে ২৮০ টাকা), এমওপি ১০ কেজি (প্রতি কেজি ১৩ টাকা দরে ১৩০ টাকা), পরিবহন প্রতি কেজি ৩ টাকা দরে ৩৫ কেজির জন্য ১০৫ টাকা ও আনুষঙ্গিক ১ টাকা হারে ৩৫ কেজির জন্য ৩৫ টাকা হিসেবে মোট ৮৭৫ টাকা প্রদান করা হয়। এ কর্মসূচীর আওতায় ২ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন বীজ, ৯০০০ মেট্রিক টন ডিএপি, ৪৫০০ মেট্রিক টন এমওপি বিনামূল্যে কৃষককে প্রদান করা হয়। এতে বীজ বাবদ ১৪ কোটি ৬২ লাখ ৫ হাজার টাকা, ডিএপি ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, এমওপি বাবদ ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ও পরিবহন ও আনুষঙ্গিক বাবদ ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা হিসেবে মোট ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ আসাদুল্লাহ বলেন, ‘দুতিন বছর ধরে আমরা বৃষ্টিনির্ভর আউশ চাষে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। এতে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় কম। আমরা বীজ-সার প্রান্তিক কৃষকদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিচ্ছি। কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ পেয়ে খুশি। কম খরচে উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।’

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির করতে হলে একমাত্র আউশ ফসলই হচ্ছে ভরসা। এ ধান আবাদে সেচ কম লাগে। খরচও একেবারে কম। আবার সময়মতো আবাদ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে কৃষিমন্ত্রী আউশ ধানের আবাদ বৃদ্ধির প্রতি জোর দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, দেশে আউশের আবাদ একেবারেই কমে গিয়েছিল। অথচ এই একটি ফসল কম খরচে স্বল্প সময়ে বেশি উৎপাদন করা যায়। তাই আমরা আউশের আবাদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এ জন্য যা যা করণীয়, করতে প্রস্তুত মন্ত্রণালয়। আউশ আবাদ বাড়াতে চলতি মৌসুম থেকে আরও বেশি প্রান্তিক কৃষককে সরকারী প্রণোদনার আওতায় আনার কাজ করছে মন্ত্রণালয় ও কৃষি অধিদফতর।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক পতিত জমি আছে। যেগুলোতে এক সময় আউশ ফসল হতো। বিশেষ করে সিলেট, বরিশাল অঞ্চলে। আমরা সেই পতিত জমিগুলোতেই আউশ আবাদের জন্য বেশি জোর দিচ্ছি। নানা প্রণোদনা ও সুবিধা দিচ্ছি যাতে জমির মালিকরা তাদের পতিত জমিগুলোতে আউশ আবাদ করেন। ইতোমধ্যে আমরা ভাল সাড়াও পেয়েছি। আশা করছি, বোরোর পর আউশেও কৃষক ভাল ফলন ঘরে তুলতে পারবেন।

বর্তমানে অবমুক্তকৃত উচ্চফলনশীল জাতের চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। আউশ ধান দুইভাবে চাষ করা হয়। বোনা আউশ এবং রোপা আউশ। বোনা আউশের জনপ্রিয় আধুনিক জাতসমূহ ব্রিধান ৪৩, ব্রিধান ৬৫, ব্রিধান ৮৩ এবং বিনাধান-১৯। রোপা আউশ ধানের আধুনিক জাতসমূহ ব্রিধান ৪৮, ব্রিধান ৮২, ব্রিধান ৮৫, বিনাধান-১৯ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান ৭।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আউশের প্রতিটি জাতই উদ্ভাবকদের প্রত্যাশার চেয়ে অন্তত ৫০০ কেজি থেকে দেড় টন পর্যন্ত বেশি ফলন দিচ্ছে। জাতগুলো হেক্টর প্রতি বোরো মৌসুমের মতো ফলন দিতে সক্ষম। বোরো ধান কাটার পর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নতুন জাতের আউশ ধান আবাদ করা যায়। আউশের পর আগস্টে আমন ধান করা যায়। এক জমিতে কৃষক তিনবার ধান ফলাতে পারেন। এ জাতগুলো ছড়িয়ে দিয়ে আউশ মৌসুমে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *