চিকিৎসকদের করতালিতে বাড়ি ফিরলেন করোনাজয়ীরা

চিকিৎসকদের করতালিতে বাড়ি ফিরলেন করোনাজয়ীরা

তাজা খবর:

প্রতিদিনই যখন করোনা শনাক্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, তখন তারা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ছেন। শুধু তাই নয়, করোনাকে জয় করে হাসপাতাল ত্যাগ করা রোগীদের করতালির মাধ্যমে বিদায় জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। দিনটা তাই নিঃসন্দেহে অন্যরকম। শনিবার (২ মে) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এমন দৃশ্যের অবতারণা হয় রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়া ৯ ব্যক্তিকে করতালি দিয়ে বিদায় জানিয়েছেন চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মকর্তা। করোনা থেকে বেঁচে ফেরার পর এমন মুহূর্তের মুখোমুখি হতে পেরে রোগীরাও বেশ আনন্দিত।

শনিবার বেলা সোয়া ১২টার দিকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের গেটের সামনে জড়ো হতে থাকেন চিকিৎসকরা। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের একটু ভিন্নভাবে বিদায় জানাতেই তাদের এই আয়োজন। এরপর গেটের সামনে আসেন হাসপাতালটির অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক শাহ গোলাম নবী এবং করোনার ফোকালপারসন অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানসহ অন্যান্য চিকিৎসক।

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বের হতে থাকেন সুস্থ হওয়া রোগীরা। তাদের মধ্যে ছিলেন দুজন চিকিৎসকও। এভাবে একে একে ৯ ব্যক্তি চিকিৎসকদের করতালির মাধ্যমে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এর আগে, শুক্রবারও মুগদা জেনারেল হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ জন। হাসপাতালটিতে এখন ভর্তি আছেন ২৮৯ জন।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানান কয়েকজন। দৈনিক প্রথম আলোর সাংবাদিক শওকত হোসেন মাসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই হাসপাতালে এসেছি ২০ এপ্রিল। আমি হাসপাতালের দ্বিতীয় রোগী। ওয়ার্ডে ছিলাম দুদিন। স্বাভাবিকভাবে ওয়ার্ডে থাকা সহজ না। পরে আস্তে আস্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবকিছু গুছিয়ে এনেছেন, আমিও কেবিনে গিয়েছি। আইসিইউতেও ছিলাম। সব মিলিয়ে ডাক্তাররা আমাকে অনেক সহায়তা করেছেন। এখন ভালো আছি। দুবার করোনা পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ এসেছে।’

এদিকে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে ঢাকার টিকাটুলির বাসায় আসেন শিক্ষার্থী মো. জায়েদ। দুদিন ত্রাণ বিতরণের কাজে বের হন তিনি। সেখান থেকেই করোনায় আক্রান্ত হন বলে আশঙ্কা তার। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মো. জায়েদ বলেন, ‘আমাদের পরিবারের তিন জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা ২১ এপ্রিল এখানে ভর্তি হই। আমি আমার ভাই এবং আমার দাদু। আমার ছোট ভাই শুক্রবার (১ মে) সুস্থ হয়ে বাসায় গেছে। আমি আজকে যাচ্ছি। আমার দাদু এখনও হাসপাতালে আছেন, তবে তিনি আগের চেয়ে ভালো আছেন। এখানে যতদিন ছিলাম, চিকিৎসকরা আমাদের যথেষ্ট লক্ষ রেখেছেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের চিকিৎসা করেছেন, আমি তাদের জন্য দোয়া করি। আসলে ভয়ের কোনও কারণ নেই, মানসিকভাবে ফিট থাকতে হবে। মনের শক্তিটাই বড় শক্তি।’

করোনা পজিটিভ রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হন মুগদা হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার বনি আমিন। তিনি বলেন, ‘আমি আক্রান্ত হয়েছি ১২ এপ্রিল। এরপর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম ১৩ থেকে ২৩ এপ্রিল। পরে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তরিত হই। আমার অভিজ্ঞতা খুবই ভালো। ডাক্তাররা কো-অপারেটিভ। যদিও ডিসটেন্স ম্যানটেইন করে রোগী দেখছেন, এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়। জনসচেতনতা খুবই জরুরি।’

কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড ডক্টর ফোরামের সভাপতি ও হাসপাতালটির চিকিৎসক অধ্যাপক মনিলাল আইচ লিটু বলেন, ‘করোনার কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। করোনা আক্রান্তদের ৮০ শতাংশের কোনও চিকিৎসা লাগে না। এরমধ্যে ২৩ শতাংশ সিনড্রোমেটিক, বাকিদের মাইল্ড সিন্ড্রোম। এখানে সাপোর্টিং চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেকেন্ডারি ইনফেকশন যাতে না হয় সেজন্য এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। কখনও কখনও নিওমোনিয়া বেশি হলে অক্সিজেন, আইসিইউ সাপোর্ট লাগে, সেগুলো দেওয়া হয়। করোনার জন্য তো কোনও ওষুধ নেই। রোগীর যে লক্ষণ প্রকাশ পায়, সেই অনুযায়ী আমরা চিকিৎসা দিয়ে থাকি।’

রোগীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মনিলাল আইচ লিটু বলেন, ‘রোগীরা অনেক সময় বোঝেন না, করোনার যে আলাদা চিকিৎসা নাই। সেকারণে কেউ কেউ অভিযোগ করেন। করোনার এই হাসপাতালগুলো কিন্তু বিশেষায়িত হাসপাতাল। এখানে কিন্তু ডাক্তার বারবার রোগীর কাছে যান না। ডাক্তাররা রাউন্ড দেন, দেখেন কোন রোগীর কী সমস্যা। সেই অনুপাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমাদের হাসপাতালে চালু করেছি, ওয়ার্ড থেকে রোগীরা টেলিফোন করে ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। আমাদের এখানে সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে, ডায়ালাইসিস হচ্ছে। কাজেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না এই অভিযোগ সঠিক না।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *