রায় দেওয়ার দিন আজ

জনগণের রায় দেওয়ার দিন আজ

তাজা খবর:

আজ রবিবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সমমনা দলগুলোর বর্জন এবং নাশকতার কিছু ঘটনার পরও এই নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে ভোট উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

তবে এবার কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতিই বড় চ্যালেঞ্জ।

ভোটার উপস্থিতির ওপর নির্বাচনী ফলাফলে বহির্বিশ্বের স্বীকৃতির বিষয়টিও নির্ভর করছে। যদিও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। বেসামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই নির্বাচন ঘিরে শুরু থেকেই নানামুখী উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল। বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছে বিএনপিসহ বেশ কিছু দল। আর সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে শুরু থেকেই অনড় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নে তৎপর ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ।

সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টির চেষ্টাও ছিল তাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুসরণ করে গত ১৫ নভেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। দাবি পূরণ না হওয়ায় নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী আন্দোলনসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ১৬টি রাজনৈতিক দল। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো ভোট বর্জনের আহবান জানিয়ে মিছিল-সমাবেশ, অসহযোগ, অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল পালন করছে বিএনপি।

তফসিল অনুযায়ী ইসি ভোটগ্রহণের সব আয়োজন সম্পন্ন করলেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমেনি। নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় বড় ধরনের কোনো সহিংসতা না ঘটলেও গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর গোপীবাগে ট্রেনে অগ্নিসংযোগ ও দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনায় উৎকণ্ঠা বেড়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৪টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। এসব ঘটনায় ছয়টি যানবাহন ও ৯টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইসি। এ অবস্থায় গতকাল দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি ও ইসির প্রস্তুতির বিস্তারিত তুলে ধরেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল।

বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘একটি পক্ষের ভোট বর্জনের কারণে সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রেও আগুন দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কোনো দল যদি এটি করে থাকে, এটি অমার্জনীয় অপরাধ বলে মনে করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘যারা হরতাল দিয়েছে, তারাও বলেছিল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করবে। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম শান্তিপূর্ণভাবে ভোটারদের মাঝে (তারা) ভোটবিরোধী প্রচারণা চালাবে।’

নির্বাচনে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল আসেনি এবং ইভিএম ও সিসিটিভি চেয়েও পাওয়া যায়নি, এ অবস্থায় নির্বাচনকে কতটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘কতটা নিয়ন্ত্রিত হবে সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। সর্বাত্মক চেষ্টা হচ্ছে। সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো একটা বিরোধী পক্ষ ভোট বর্জনের পাশাপাশি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। এতে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে উঠিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সংকট দেখা দিতে পারে। এই বাস্তবতাটা অস্বীকার করছি না। তবে আশা করি, বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি মোকাবেলা করে জনগণের অংশগ্রহণে ও ভোটারদের কেন্দ্রে আগমনে নির্বাচন উৎসবমুখর হয়ে উঠবে।’

এবারের নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পাঁচ বছরের জন্য তাঁদের আইন প্রণেতা নির্বাচিত করবেন। ইসিতে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৮টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছে। নওগাঁ-২ আসনের এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯ আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন এক হাজার ৯৭০ জন প্রার্থী।

এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৩ জন। এর মধ্যে ছয় কোটি সাত লাখ ৭১ হাজার ৫৭৯ জন পুরুষ এবং পাঁচ কোটি ৮৯ লাখ ১৯ হাজার ২০২ জন নারী। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ৮৫২ জন ভোটার রয়েছেন। আর প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন এক কোটি ৫৪ লাখ ৫২ হাজার ভোটার।

নির্বাচনে ৪২ হাজার ১০৩টি কেন্দ্রের দুই লাখ ৬১ হাজার ৯১২টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে। সব আসনেই সনাতন পদ্ধতিতে ব্যালট পেপার ব্যবহার করে ভোটগ্রহণ চলবে। কারচুপি এড়াতে আজ সকালে ৯৩ শতাংশ কেন্দ্রে, অর্থাৎ ৩৯ হাজার ৬১টি কেন্দ্রে ব্যালট পেপার যাবে। দুর্গম এলাকাগুলোতে এরই মধ্যে ব্যালট পেপার পৌঁছে গেছে।

নির্ধারিত সময়ে ভোটগ্রহণ শেষে ভোট গণনা শুরু হবে। ভোট গণনার কাজ শেষ হওয়ার পরপরই প্রত্যেক প্রিজাইডিং অফিসার ব্যবহৃত ব্যালট পেপারভর্তি সিলমোহরকৃত বিভিন্ন ধরনের প্যাকেট, ভোট গণনার বিবরণী ও ব্যালট পেপারের হিসাব সরাসরি অথবা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাবেন। তিনি প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল যোগ করে প্রত্যেক প্রার্থীর ফলাফল নির্ধারণ করবেন।

দ্বাদশ সংসদ সংসদ নির্বাচন দেখার জন্য প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ ছাড়া নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দেশি ২০ হাজার ৭৭৩ জন পর্যবেক্ষককে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে ৪০টি পর্যবেক্ষণ সংস্থার ৫১৭ জন এবং স্থানীয়ভাবে ৮৪টি পর্যবেক্ষণ সংস্থার ২০ হাজার ২৫৬ জন ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন। বিদেশ থেকে সাংবাদিক এসেছেন ৯২ জন। এ ছাড়া দেশের ১০ হাজারের বেশি সাংবাদিককে নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ভোটার, প্রার্থী ও নাগরিকদের বিভিন্ন তথ্যের নিশ্চয়তা দিতে ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি’ নামের একটি অ্যাপ চালু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই অ্যাপে ভোটার নম্বর, কেন্দ্রের নাম ও লোকেশন, ভোট পড়ার হার, প্রার্থীদের হলফনামাসহ নির্বাচনের বিভিন্ন তুলনামূলক চিত্র ঘরে বসেই যে কেউ জেনে নিতে পারবেন। অ্যাপে কেন্দ্রভিত্তিক দুই ঘণ্টা পর পর ভোট পড়ার হার জানা যাবে। ভোটকেন্দ্রের তথ্য এখনই জানতে পারছেন, যেকোনো ভোটারের ভোটকেন্দ্র কোনটি এবং লোকেশন কোথায় জানা যাচ্ছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও এবারই প্রথম গণপরিবহন চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ২৪ ঘণ্টার জন্য ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্যাক্সি ক্যাব চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসনের সদস্য ও অনুমোদিত পর্যবেক্ষক, জরুরি সেবার যানবাহন, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অভিন্ন কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং সংবাদপত্র বহনকারী সব ধরনের যানবাহন, দূরপাল্লার যানবাহন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাঁদের এজেন্টদের ক্ষেত্রে এই বিধি-নিষেধ শিথিল করা হবে। সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, জাতীয় মহাসড়ক, প্রধান আন্ত জেলা রুট, মহাসড়ক এবং প্রধান মহাসড়কের সংযোগ সড়কের ক্ষেত্রেও বিধি-নিষেধ শিথিল করা হবে।

গত ১৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৭ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষে ১৮ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। ওই দিন থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *