ডোপ টেস্টে পজিটিভ হলেই চাকরিচ্যুত

ডোপ টেস্টে পজিটিভ হলেই চাকরিচ্যুত

তাজা খবর:

মাদকের বিরুদ্ধে এতকাল অভিযান চালিয়ে এসেছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এবার সেই পুলিশের বিরুদ্ধেই মাদকবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, যা নজিরবিহীন হলেও প্রশংসা করেছেন বিশ্নেষকরা।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাহিনীর সন্দেহভাজন মাদকাসক্ত সদস্যদের ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন পদমর্যাদার শতাধিক পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্ট করা হয়। ওই টেস্টে ২৬ সদস্য মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়া এসব পুলিশ সদস্যের বেশিরভাগই ইয়াবায় আসক্ত ছিলেন। এখন বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে তাদের চাকরিচ্যুত করার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সূত্র বলছে, তবে এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় ধাপেও ডিএমপিতে একই আদলে পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্ট করা হবে। পরীক্ষায় পজিটিভ হলেই তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের এমন প্রক্রিয়ায় ডোপ টেস্ট করার ঘটনা নজিরবিহীন। এর আগে বিভিন্ন সময় দু-একজন সদস্য মাদক সেবন বা মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচ্ছিন্নভাবে শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এভাবে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে মাদকাসক্ত সদস্যদের শনাক্ত করার পরিকল্পিত প্রয়াস অতীতে দেখা যায়নি। বাহিনীর মাদকাসক্ত সদস্যদের কঠোর বার্তা দিতে চায় পুলিশ প্রশাসন। পাশাপাশি অন্যান্য পেশার মাদকাসক্তদেরও শোধরাতে হবে। নতুবা কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ডিএমপি কমিশনার হিসেবে আমি যোগদানের পরপরই সাবধান করেছিলাম পুলিশে যারা মাদকাসক্ত, তারা যেন নিজেদের শুধরে নেয়। একাধিকবার সতর্ক করেছি। এরপর ডিএমপির ডিসিদের মাধ্যমে তালিকা করেছি। যারা মাদকাসক্ত, এমন সন্দেহভাজন সদস্যদের তালিকা করে সিআইডির ল্যাবে তাদের রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ডিএমপির ১০০ জনের বেশি সদস্যের টেস্ট করা হয়। এতে ২৬ জন মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। পুলিশ মহাপরিদর্শক পরামর্শ দিয়েছেন, পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ক্লিন ইমেজ থাকতে হবে। মাদকসেবী সদস্যদের চাকরিতে রাখা হবে না।

ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, আমরা সব লেভেলের পুলিশ সদস্যদের এই টেস্টের আওতায় নিয়ে আসব। যে পদমর্যাদার হোক না কেন, আমরা কাউকেই ছাড়ব না। ডোপ টেস্টের জন্য সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠান। সিআইডি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরীক্ষাগার। রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যরা যাতে ভবিষ্যতে কোনো সুবিধা নিতে না পারে, সে জন্য সিআইডির পরীক্ষাগারে ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। এই পরীক্ষা চলমান থাকবে।

সমকালের সঙ্গে কথা বলার আগে গতকাল শনিবার রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে নবসৃষ্ট ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয় উদ্বোধন শেষে ঢাকার পুলিশপ্রধান এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, ডোপ টেস্টে যাদের পজিটিভ এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে বাকিদের জন্য সুস্পষ্ট বার্তা যাবে যে, আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। এ উদ্যোগের ফলে অনেকে ভালো হয়েছে এবং এ রাস্তা থেকে ফিরে এসেছে। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যারা মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে বা মাদক ব্যবসায়ীকে সহযোগিতা করছে, সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনোরকম শিথিলতা দেখানো হচ্ছে না। সাধারণ মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, ঠিক সেভাবেই মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

এ বিষয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা সমকালকে বলেন, মাদকসেবী পুলিশ সদস্যদের চাকরিচ্যুত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো। কারণ দায়িত্বশীল একজন সরকারি চাকরিজীবীর মাদকাসক্তিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তার দায়িত্বই অপরাধ দমন করা। অথচ তিনি নিজেই মাদক সেবনের মতো অপরাধ করবেন- এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মাদকসেবীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আছে। তবে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে মাসে মাসে বেতন দিয়ে পুনর্বাসনে রাখাও মুশকিল।

ডিএমপির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, মাদকসেবী হিসেবে শনাক্ত ২৬ জনের মধ্যে কনস্টেবল থেকে এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট, চারজন এসআই, তিনজন এএসআই, একজন নায়েক ও ১৭ জন কনস্টেবল। তারা ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন, পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিওএম) চারজন, কল্যাণ ও ফোর্সের চারজন, ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি জোনের সাতজন এবং বাকিরা পল্লবী, আদাবর, খিলগাঁও, উত্তরখান ও গেন্ডারিয়া থানায় কর্মরত বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডোপ টেস্টে যাদের পজিটিভ এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সার্জেন্ট মুনতাসিম, এসআই মো. জাহাঙ্গীর, কনস্টেবল রাসেল, দীন ইসলাম, জুয়েল, আশরাফুল ও বারী। তারা সবাই ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি ডিভিশনের সদস্য।

ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, হঠাৎ তিনি জানতে পারেন দায়িত্ব পালনকালে তার ইউনিটের কিছু সদস্য প্রায়ই ঝিমুনিভাব নিয়ে থাকেন। তারা অ্যালার্ট থাকেন না। এর পরই তাদের মাদক সংশ্নিষ্টতার ব্যাপারে সন্দেহ হয়। প্রথম দফায় সাতজনের ডোপ টেস্ট করানোর পর অধিকাংশের রেজাল্ট পজিটিভ আসে। এর পরই ওই ইউনিটের আরও ১৮ জনের পরীক্ষা করা হয়। তবে দ্বিতীয় দফার পরীক্ষায় মাত্র একজনের পজিটিভ আসে। বাকিদের নেগেটিভ আসে। তখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়, হয়তো ধরা পড়ার হাত থেকে বাঁচতে প্রস্রাবের সঙ্গে কৌশলে পানি মেশানো হয়েছে। এর পর থেকে পরীক্ষার ব্যাপারে আরও সতর্ক হয়ে যান সংশ্নিষ্টরা।

পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলছেন, নানা কারণে পুলিশের এসব সদস্য মাদকাসক্ত হন। তা হলো- সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি, অনেক আগে থেকে মাদকের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত হওয়া।

পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হলো মাদক নির্মূল করা। পুলিশ মাদক থেকে দূরে থাকবে, আবার মাদক কারবারিদেরও রুখে দেবে। মাদকের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করার বিষয়টি পুলিশ অগ্রাধিকার দিতে চায়। তবে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় নানা সময়ে পুলিশের অসাধু সদস্যদের নাম উঠে আসে, যারা মাদক সিন্ডিকেটে নানাভাবে যুক্ত।

ডিএমপির একাধিক ডিসি জানান, ঘরের ভেতরে মাদকের ব্যাপারে শুদ্ধি অভিযানের ব্যাপারে পুলিশের হাইকমান্ড থেকে একাধিকবার বার্তা পাওয়ার পর তা মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জানানো হয়। বারবার সতর্ক করার পরও যারা মাদকের পথ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এমন কঠোর বার্তা পাওয়ায় অনেকে নিজে নিজেই মাদক থেকে দূরে চলে এসেছেন। আবার অনেককে পাওয়া গেছে যারা মাদক সেবন করছেন, মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যও আছে।

জানা গেছে, ডিএমপির ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস ডিভিশন-আইএডির মাধ্যমেও মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যের তালিকা করা হচ্ছে।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, মাদকসেবী ও মাদক কারবারি কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি পুলিশের কোনো সদস্য মাদক সেবন বা মাদক কারবারে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন সমকালকে বলেন, ডোপ টেস্টে শনাক্ত ২৬ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। এখন অভিযোগের অনুসন্ধান হবে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি এগোবে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২০১৮ সালে উত্তরায় র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে নির্দেশ দেন। এর পর থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে এখনও মাদক কারবার চলছে। করোনা মহামারির মধ্যেও ইয়াবাসহ মাদক কারবারিরা সক্রিয়।

জানা গেছে, সম্প্রতি পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ ২০-২১ জনের সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ডিএমপি কমিশনারের কাছে চিঠি দেয়। তারা মাদক সিন্ডিকেটে সংশ্নিষ্ট। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ও রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে তেজগাঁওকেন্দ্রিক মাদক কারবারিদের সেকেন্ড ইন কমান্ড শারমিন ওরফে স্বপ্নাসহ অন্তত ২০ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই মাদক কারবারে পুলিশের সংশ্নিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। নেপথ্যে থেকে মাদক কারবারিদের সহযোগিতার দেওয়ার ব্যাপারে মূল ভূমিকা পালন করেন শিল্পাঞ্চল থানার সাবেক একজন এসআই।

সম্প্রতি ডিএমপির মাসিক অপরাধ সভায় মাদক কারবারে পুলিশের সংশ্নিষ্টতা ও মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এতে ঢাকার ৫০টি থানার ওসি ও পুলিশের সব ইউনিটের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভা থেকেও ডিএমপি কমিশনার মাদকের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *