তারুণ্যেই মহিমান্বিত জীবনে

তারুণ্যেই মহিমান্বিত জীবনে

তাজা খবর:

লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদের দুঃশাসনের সময় ঢাকার একটি স্কুলের ছাত্র রাদওয়ান মুজিব, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র। মা শেখ রেহানা, পিতা শফিক সিদ্দিক- খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ। শিশুটি বিস্ময়ে লক্ষ্য করে স্কুলের বন্ধুদের বাবা-মায়েরা তাকে এড়িয়ে চলেন, সন্তানদের নিষেধ করেন তার সঙ্গে মেলামেশা করতে। একটু বড় হয়ে বুঝেছেন- ‘নিষিদ্ধ’ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণেই এমন ‘নিষেধাজ্ঞা’।

১৯৮০ সালের ২১ মে জন্ম তার, মা শেখ রেহানা তখন লন্ডনে নির্বাসিত। কোনও রকমে বেঁচে থাকার জন্য সন্তান গর্ভে নিয়েই শীতের শেষ রাতে বাসা থেকে বের হয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে ট্রেনে চেপে পৌঁছেছেন কর্মস্থলে, ফিরেছেন সন্ধ্যার পর। সে সময় জিয়াউর রহমানের দুঃশাসন চলছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে যিনি আইন করেছিলেন- প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনওভাবেই বঙ্গবন্ধুর কথা বলা বা লেখা যাবে না।

আমরা পাকিস্তান আমলের গোয়েন্দা রিপোর্টে ১৯৫৮ সালের ২৯ নভেম্বরের একটি প্রতিবদনে দেখতে পাই এ বিবরণটি-

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সামরিক শাসন জারির পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করার সময় জানাচ্ছেন- সিদ্ধেশ্বরীর বাসাটির আশপাশ জঙ্গলে ভরা, পানির কষ্ট। কিন্তু নতুন কোনো বাসাও ভাড়ার জন্য পাওয়া যাচ্ছে না। ভাড়া নিতে গেলে বাড়িওয়ালারা বলে- শেখ মুজিবের পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দিলে সরকারের রোষানলে পড়তে হবে। [গোয়েন্দা রিপোর্ট, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯]

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পিতার সঙ্গে ওই সাক্ষাতের সময় মায়ের সাথেই ছিলেন। অবশ্য তারা সব সময়েই সাধারণ ও কষ্টের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি অফিস ও বাসভবন নির্মিত হলে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি ছাড়ার প্রশ্ন উঠলে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব উত্তরে বলেন- “সরকারি ভবনের আরাম-আয়েশে প্রতিপালিত হলে ছেলেমেয়েদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে অহমিকাবোধ ও উন্নাসিক ধ্যান-ধারণা সৃষ্টি হবে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।” [ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াÑ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৭৪]

রাদওয়ান মুজিবের জীবনযাপনে এমন মহত্তম উত্তরাধিকারের ছাপ স্পষ্ট। সবার সঙ্গে মিশতে পারেন, প্রোটোকল সুবিধা নিয়ে মাথা ঘামান না। নিজের মা ও খালাকে মনে করেন- “সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণময়ী নারী, পুরুষোত্তম পিতার সংগ্রামী আদর্শ আর সর্বংসহা মাতার অসীম ধৈর্য যাদের এগিয়ে যাওয়ার পুঁজি।”

রাদওয়ান মুজিব বিশ্বখ্যাত লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিস্ক থেকে রাজনীতি ও ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক হওয়ার পর ‘কমপারেটিভ পলিটিক্স’ বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। মেধা-মননের সঙ্গে সাংগঠনিক দক্ষতা অতুলনীয় তার। ২০০৭ সালের ২২ এপ্রিল শেখ হাসিনা লন্ডন থেকে ঢাকা ফেরার সময় বাংলাদেশের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে তাকে বাঁধা দেওয় হয়।

কিন্তু শেখ হাসিনা অদম্য। তিনি লন্ডনে সংবাদ সম্মেলন, পার্লামেন্ট সদস্য ও সিভিল সোসাইটির সঙ্গে আলোচনা ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে তাকে বাঁধা দেওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিপন্নতার জাজ্জ্বল্যমান নজির হিসেবে তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা ৭ মে (২০০৭) দেশে ফিরে আসেন, কিন্তু কয়েকদিন পরেই প্রতিহিংসাপরায়ন সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বন্দিজীবন স্থায়ী হয় প্রায় এক বছর। ‘গণতান্ত্রিক শাসন ফিরিয়ে আনায় অঙ্গীকারবদ্ধ সরকার’ কেন এমন আচরণ করছে- তার কারণ রাদওয়ান মুজিব তুলে ধরেন বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক স্যার ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে।

উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা যার সাক্ষাৎ পেতে ব্যাকুল থাকেন, সে-ই ডেভিড ফ্রস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ঢাকায় এসে।

‘বাংলাদেশের জনগণকে ভালবাসি এটাই আমার গুণ, আর প্রধান দুর্বলতা- বাংলাদেশের জনগণকে খুউব ভালবাসি’, এ অমর উক্তি বঙ্গবন্ধু তার কাছেই করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব ২০০৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি স্যার ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কেবল শেখ হাসিনাই। তাকে বন্দি রেখে গণতন্ত্র আনা যাবে না।’

বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বোনের পুত্র রাদওয়ান মুজিব- যার নিজের বোন টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টে টানা তিন বার নির্বাচিত হয়েছেন। রাদওয়ান নিজের মেধা-কর্মদক্ষতার গুণে বাংলাদেশ কিংবা বিশ্বের অনেক দেশে অথবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ সুবিধার চাকরিতে নিয়োজিত হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিলেও নিশ্চিত পাবেন সাফল্য। কিন্তু নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন এমন কিছু কাজে, যা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে তরুণ প্রজন্মকে উদ্ধুদ্ধ -অনুপ্রাণিত-সংগঠিত করায় সহায়ক হবে।

সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন বা সিআরআই নামের প্রতিষ্ঠানটির তিনি অন্যতম প্রাণপুরুষ। যে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাকে তুলে ধরে ধরার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন এমন একটি ফর্ম, যা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের কাছে আকর্ষণীয়। এ পর্যন্ত মুজিব গ্রাফিক নভেল-এর ৮ম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, শহর-গ্রাম সর্বত্র তার বিপুল চাহিদা।

শেখ হাসিনার জীবন কথা- হাসিনা:আ ডটার’স টেল নির্মাণের প্রধান উদ্যোক্তাও তিনি। ছয়-সাত বছর শুটিং চলেছে। কত ফুটেজ খরচ হয়েছে। তার মধ্য থেকে বেছে নিতে হয়েছে ঘণ্টা দেড়েকের মালমশলা। বাংলা একাডেমিতে একটি প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের সঙ্গে আলোচনায় রাদওয়ান মুজিব বলেছিলেন অসাধারণ এ কাহিনীচিত্র নির্মাণের ভেতরের কথা।

তিনি বলেন, “ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি, আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, ভয়ডরহীন সংগ্রামী মানুষ- যিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে স্বদেশে ফিরে বলেছিলেন- ‘আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’ কতভাবেই না শেখ হাসিনাকে তুলে ধরা যায়। কিন্তু নবীন প্রজন্ম এ চলচ্চিত্র থেকে এর বাইরেও এক নারীকে দেখতে পেয়েছে- যিনি সব কাজের মাঝেও বইয়ে মগ্ন থাকতে পারেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য রান্নার খুন্তি হাতে নিতে কিংবা নাতী-নাতনীদের রিকশা ভ্যানে চড়িয়ে অথবা তাদের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলে নির্মল আনন্দ উপভোগ করতে জানেন। আবার তিনিই শত বাধা উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ির অভিশাপ থেকে মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন।”

বঙ্গবন্ধু কিংবা তার কন্যাদের নিষিদ্ধ করে রাখা যায় না। আপন মহিমায় তারা উদ্ভাসিত হয়েছেন। তাদের জীবন নিবেদিত রেখেছেন মুক্তির সংগ্রামে। তাদের কথা নবীন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার কাজ বেছে নিয়েছেন রাদওয়ান মুজিব। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ত্যাগ-সাহস-স্বপ্ন গাঁথা তুল ধরার জন্য নির্দিষ্ট ছকে থাকতে চান না তিনি, সর্বদা অনুসন্ধানী নজর তার, নতুন কিছু করার জন্য। বাংলাদেশের গৌরবের ইতিহাস কেবল পরীক্ষায় পাসের জন্য নয়, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলায় তা প্রতি মুহূর্তের প্রেরণা- শিশু-কিশোরদের কাছে এ বার্তা ছড়িয়ে দিতে নিরলস সাধনায় নিয়োজিত তিনি। তবে বিস্ময়ের যে এ সব তিনি করে চলেছেন নিজেকে যতটা সম্ভব আড়ালে রেখে এবং একইসঙ্গে পারিবারিক,সামাজিক ও পেশাগত গুরু দায়িত্বের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রেখেই। বড় লক্ষ্য তার- তরুণ প্রজন্মকে জ্ঞানে-গরীমায় এমন সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলায় অবদান রাখা, যারা উন্নত বিশ্বের সারিতে নিয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে।

তারুণ্যেই মহিমান্বিত জীবনে রাদওয়ান মুজিব- অভিবাদন তাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *