তৈরি পোশাকে বিশ্বসেরার হাতছানি

তৈরি পোশাকে বিশ্বসেরার হাতছানি

তাজা খবর:

করোনা মহামারীর পরও দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামকে হটিয়ে আবার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। বরাবরের মতো শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন। দ্বিতীয় স্থানে ওঠার এই ইতিহাসটি বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। স্বাধীনতার ৫০তম বছরে এসে এখন বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প নতুন এক স্বপ্ন দেখছে। পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার পাশাপাশি এই শিল্পের উদ্যোক্তারা চাইছেন এক নতুন সুতায় তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে। প্রচলিত তুলার সুতায় তৈরি পোশাকের বদলে, মানুষের তৈরি কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেইড ফাইবারের তৈরি পোশাক উৎপাদন করে চীনকে পেছনে ফেলে গার্মেন্ট রপ্তানির শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।

গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনীতির দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের রপ্তানি কমলেও একই সময়ে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে শতকরা ৮০ ভাগ। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র চার দশক আগে যাত্রা শুরু করে এই শিল্পে এখন তৈরি পোশাকের মোট কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ৩০০টি প্রায়। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১ হাজার ৮৭৪টি কারখানা। উপরন্তু ১৩৫টি পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে, যার শীর্ষ ১০টির মধ্যে ৭টিই বাংলাদেশের। আরও প্রায় ৫০০টি সবুজ কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের কাছে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছে।

আশিরর দশকে প্রয়াত নুরুল কাদের খানের হাত ধরে যে শিল্পটি ১৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছিল, সেই শিল্পে এখন শ্রমিকের সংখ্যা অর্ধ কোটির কাছাকাছি। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে পোশাক কারখানায় শ্রমিক ছিল ৪ লাখের মতো। আর ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ১৩ লাখ। ২০০২-০৩ থেকে ২০০৪-০৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছিল ২০ লাখ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এই শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ লাখে। আর বর্তমানে এই খাতটিতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই (প্রায় ৭০ শতাংশ) নারী শ্রমিক বলে দাবি বিজিএমইএর।

গত ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছে, ২০১১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম ছিল। এই ঘাটতি পুষিয়ে গত বছর দেশটিকে ধরে ফেলেছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি এখন বাংলাদেশ। দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও চীনের মতো রপ্তানিই বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান শক্তি। আর এই রপ্তানি বাড়ার অন্যতম প্রধান খাত হচ্ছে তৈরি পোশাক। পোশাক রপ্তানি বাড়ার পেছনের অন্যতম কারণ বিপুল পরিমাণ নারী শ্রমিক এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অল্প মজুরি। পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রমক্ষেত্রে নারীদের এমন উপস্থিতি চোখে পড়ে না।

তৈরি পোশাকে গত চার দশকের এই সাফল্য নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে গার্মেন্ট উদ্যোক্তাদের। তৈরি পোশাক খাতে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ নিতে এখন ম্যান মেইড ফাইবার বা মানুষের তৈরি কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। এতে একদিকে যেমন পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে তেমনি উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরির মাধ্যমে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য ছিল হাতে গোনা। মূলত পাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল দেশের রপ্তানি আয়। এ কারণে এটিকে বলা হতো সোনালি আঁশ। আশির দশক থেকে চিত্রটা বদলাতে থাকে। দেশের উদ্যোক্তারা আরেক সোনার সন্ধান পেয়ে যান। তারা সুতোয় বোনা কাপড়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু করেন। দেশে একে একে স্থাপন হতে থাকে গার্মেন্ট কারখানা। তার পরের গল্পটি শুধুই সাফল্যের ইতিহাস। ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০তম বছরে এসে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগ দখল করে রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। বহির্বিশ্বে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিংয়ের যে প্রচারণা চলছে তার পুরোভাগেও রয়েছে এই শিল্পটি। শুধু রপ্তানি খাত নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও এখন এই খাতটি শীর্ষে। তবে এসব কিছুর পরও উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বিশ্বে ১ নম্বরে ওঠার স্বপ্নটি নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা চাইছেন ম্যান মেইড ফাইবার কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের শতকরা ৭৪ ভাগই হচ্ছে কটন বেইজড। মূলত পাঁচটি বেসিক আইটেমের ওপর দেশের ৭৫ শতাংশ পণ্য তৈরি হয়। আবার এসব পোশাক তৈরি করতে অন্তত ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ওভেন ফেব্রিক আমদানি করতে হয়। স্বল্প বৈচিত্র্যের কটনের বেইজড পোশাক দিয়ে খুব বেশি দিন বিশ্ববাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এ জন্য ম্যান মেইড ফাইবার কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। আর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ টানার যুক্তি দিয়ে উদ্যোক্তারা বলছেন, (১) দেশের তৈরি পোশাক শিল্প থেকে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন ঝুটপণ্য উৎপাদিত হয়। শুধু এই ঝুট রিসাইকেল করে যদি সুতা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে অন্তত এই খাতে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব; (২) দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বিভিন্ন ধরনের স্পেয়ার পার্টস ব্যবহৃত হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৭ ধরনের পার্টস আমদানিতে ১ হাজার ৬০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ এলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে; এবং (৩) আন্তর্জাতিক বাজারের পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশের টেক্সটাইল কেমিক্যালের বাজার ২০১৯ সালে যেখানে ৮৬৪ মিলিয়ন ডলার ছিল, ম্যান মেইড ফাইবারে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই খাতে বিনিয়োগ বেড়ে ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্বব্যাংক গ্রুপ আইএফসির কাছেও তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা বাংলাদেশের পোশাক খাতের কৌশলগত এই উন্নয়নে অর্থায়ন করবে। করোনা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক গ্রুপ আইএফসির এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর প্রেসিডেন্ট ড. রুবানা হক প্রাইরিটাইজিং এফডিআই ফর দ্য সাসটেইনড গ্রোথ অব বাংলাদেশ ইকোনমি’ শীর্ষক এক উপস্থাপনায় ম্যান মেইড ফাইবার কারখানায় বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে সম্ভাবনার কথা তুলেও ধরেন। এ বিষয়ে পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট ড. রুবানা হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে বস্ত্র ও পোশাক খাতে এখন আনুমানিক বিনিয়োগের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো। টাকার অঙ্কে যেটি প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের অর্জনগুলোর মধ্যে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের অর্জন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এর অবদান অসামান্য। শুধু রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ অর্জনই নয়, ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, শিল্পায়নের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিগত দশকগুলোতে নীরব সৈনিকের ভূমিকা পালন করে চলছে আমাদের গর্বের পোশাক খাত। অর্থাৎ একটি টেকসই শিল্প বিনির্মাণে আমাদের অর্জন অনেক, তবে অনেকটা পথ এখনো আমাদের পাড়ি দিতে হবে। বিশেষ করে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির জায়গায় আমাদের আরও কাজ করতে হবে, বিনিয়োগ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নীতি সহায়তারও প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণই হবে শিল্পকে টেকসই করার আমাদের প্রধান কৌশল ও করণীয়।

তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে নিটপণ্যের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মো. হাতেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর আমাদের অনেক উদ্যোক্তা পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপন করেছেন। বিশ্বসেরা ১০টি গ্রিন ফ্যাক্টরির মধ্যে ৭টিই বাংলাদেশের। তবে শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করে এ ধরনের ফ্যাক্টরি স্থাপনের পরও বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্যের দাম বেশি পাওয় যায় না। কারণ, বাংলাদেশ থেকে এখন যেসব তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় তার সবই কটন বেইজড পণ্য। এসব পণ্য দামে কম বলে পরিমাণে অনেক রপ্তানি করেও খুব বেশি আয় হয় না। এ কারণে ফ্যাশনেবল, উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। চীনের মতো বাংলাদেশেও ম্যান মেইড কারখানা স্থাপন করে তৈরি পোশাকে শীর্ষস্থান অর্জনের পথে হাঁটতে হবে। এটিই এখন এই খাতের ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *