তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ সরকারের

তাজা খবর:

মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হতে পারে বাংলাদেশ— এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। পরিস্থিতি সেদিকে গড়ালে হলে কী করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেবে সরকার, এই প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট মহলের। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে এরইমধ্যে দেশে শ্রমিকদের অনুকূলে গত ১০ বছরে তিন বার শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। ফিরেছে কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ। প্রণয়ন করা হয়েছে পোশাক শিল্পের ‘টেকসই কৌশলগত রূপকল্প ২০৩০’। বাড়ানো হয়েছে বেতনসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। বিশ্বের রেকর্ডসংখ্যক গ্রিন কারখানা এখন বাংলাদেশে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে— বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই। নতুন মার্কিন শ্রমনীতি নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে কেউ কোনও চাপ অনুভব করছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বাধীনতা পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনন্য অর্জন হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম তৈরি পোশাক শিল্প খাত, যা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। এ খাতটি শুধু জাতীয় অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করেনি, একইসঙ্গে নিশ্চিত করেছে অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস এ শিল্পের জিডিপিতে অবদান ১১ শতাংশ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোতে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৩০টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশকে ধরা হয়। বদলে যাওয়া এই অর্জনের পেছনে সহায়ক হিসেবে রয়েছে পোশাক শিল্প।

জানা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে রফতানি ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে এ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে এরইমধ্যে সরকারের সহায়তায় পণ্য বহুমুখীকরণ, বাজার বহুমুখীকরণ, ফাইবার বহুমুখীকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন, ইনোভেশন ও টেকনোলজি আপগ্রেডেশন এবং কস্ট-কম্পিটিটিভ হওয়ার মাধ্যমে ভ্যালু চেইনে এগিয়ে থাকার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা এসব নিয়ে কাজও করছেন।

চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য এবং কানাডায় পোশাক রফতানি যথাক্রমে ৪৭৫ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন এবং ১২৮ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ২৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ১৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সময়ে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রফতানি ২৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। টাকার অঙ্কে এটি ৬৭৪ দশমিক ৮২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। প্রধান অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় রফতানি যথাক্রমে ৪৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ৫৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ২ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মডেল অনুসরণ করা হয়েছে। বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ পোশাক শিল্পের টেকসই কৌশলগত রূপকল্প ২০৩০ প্রণয়ন করেছে। এ রূপকল্পের অভীষ্ট হচ্ছে— মানুষ ও পরিবেশ, অর্থাৎ এ সবুজ গ্রহকে বিপন্ন না করে শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা, যা ইএসজির (এনভায়রনমেন্টাল সোশ্যাল গভর্ন্যান্স) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ২০০টি গ্রিন পোশাক কারখানার মধ্যে ৭৩টি প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে, ১১৩টি গোল্ড ক্যাটাগরিতে এবং ১০টি সিলভার ক্যাটাগরিতে, আর চারটি ‘লিড সার্টিফায়েড’ হিসেবে প্রত্যয়িত হয়েছে। আরও প্রায় ৫০০টি বাংলাদেশি কারখানা লিড সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

জানা গেছে, ‘তৈরি পোশাক শিল্পের কৌশলগত রূপকল্প ২০৩০’ এর উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হচ্ছে— ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন ৩০ শতাংশ হ্রাস করতে বিজিএমইএ ইউএনএফসিসিসি’র ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি চার্টার ফর ক্লাইমেট অ্যাকশনে স্বাক্ষর করেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ জ্বালানি ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপন্ন করা। শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে এরইমধ্যে বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে পোশাক শিল্পের জন্য একটি উদ্ভাবন, দক্ষতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র (সেন্টার অব ইনোভেশন, এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড ওএসএইচ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ৬০ শতাংশ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। একই সময়ের মধ্যে প্রতিটি দেশে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ-সংবলিত পোশাক পণ্য রফতানি করে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পদচিহ্ন ছড়িয়ে দেওয়া। শিল্পে ১০০ ভাগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। শতভাগ এসডিজি স্টেকহোল্ডার অংশীদারত্ব নির্ধারণ করা। বৈশ্বিক বাজারে হাই-ফ্যাশনে সক্ষমতা প্রদর্শন করা, হাই-এন্ড ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। ২০২৬ সালের পর ‘ডাবল ট্রান্সফরমেশন রুলস অব অরিজিন’ মেনে চলতে হলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিজিএমইএ অ্যাপারেল ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার তৈরি ও মূল বাজারগুলোতে কীভাবে রফতানি আরও বাড়ানো যেতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করা। টেকনোলজি আপগ্রেডেশন করতে হবে। বাংলাদেশকে অবশ্যই সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে, যাতে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা মেটানো যায়। বাংলাদেশকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এবং বাণিজ্য বাধা কমিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। এ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রিসাইকেল শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়া, পণ্য ও সেবাকে শুল্ক ও ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখতে হবে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সম্প্রতি মার্কিন শ্রমনীতির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বাইডেন সরকারের স্মারকে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যেসব উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, এর পেছনে রাজনীতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এর ব্যবহার করতে পারে। শ্রম অধিকারের লঙ্ঘন হয়েছে মনে করলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সুযোগ রয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর পড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয় ওই চিঠিতে।

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (বাণিজ্য) মো. সেলিম রেজার লেখা চিঠিটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে পাঠানো হয় গত ২০ নভেম্বর। বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন, অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া স্মারকের সংকলিত একটি প্রতিবেদনও চিঠির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।

তবে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সেন্টার ফর সলিডারিটির প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তায় শ্রম অধিকার হরণ বা লঙ্ঘন হলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাণিজ্য এবং ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ বা সুনির্দিষ্ট কোনও দেশের কথা বলা হয়নি। তবে বাংলাদেশ এ শাস্তির আওতায় পড়লে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা আছে। শ্রমিকদের ওপর হামলা-মামলা নতুন ঘটনা নয়। নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে শ্রমিক আন্দোলনে তিন শ্রমিককে গুলি করে মারা হয়েছে। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৬০টি মামলা হয়েছে। কয়েক মাস আগে শ্রমিকদের বাঁচাতে গিয়ে শহিদুল ইসলাম নামে এক শ্রমিক নেতা খুন হয়েছেন। এসব ঘটনা এবং আগে থেকে চলে আসা শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে জানানোর প্রয়োজন নেই। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের লেবার অ্যাটাশে এসব বিষয়ে নজর রাখছেন।

গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগামী ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একটা বিবৃতি দেবে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। তবে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে সরকারকে। কারণ, তারা পরাশক্তি। বাংলাদেশের কোথায় কী ধরনের দুর্বলতা আছে, তা শনাক্ত করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘আমেরিকা-ইউরোপ মিলে পোশাক রফতানি বন্ধে যে পাঁয়তারা করছে, তা বাস্তবায়ন হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতি ও ব্যবসা আলাদা জিনিস। ইউরোপ-আমেরিকা এমন কিছু করবে না, যার প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে পড়তে পারে।’ এ ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার। এই বাজার ধরে রাখতে যা করণীয় সবই করা হবে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের জন্য বেতনসহ অন্যান্য সুবিধাদি বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সবশেষে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী নীতি সহায়তা এবং নীতি সহায়তার স্থিতিশীলতার কোনও বিকল্প নেই। যেসব নীতি সহায়তা এরই মধ্যে শিল্পের জন্য সহায়ক বলে প্রমাণিত, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সমর্থন প্রদান জরুরি।’ তারা এ সংকটময় সময়ে আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী উপস্থিতি ধরে রাখতে কয়েক বছরের জন্য স্থিতিশীল রাজস্ব নীতি, আরও প্রণোদনামূলক স্কিম, রফতানির কাঁচামাল শুল্কমুক্ত বা কম করা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে আর্থিক সহায়তা প্রদান প্রভৃতির কথা ভাবতে পারে বলে জানিয়েছেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *