দুর্যোগ-অগ্নিসন্ত্রাস মোকাবিলা করেছি করোনাও কাটিয়ে উঠব

দুর্যোগ-অগ্নিসন্ত্রাস মোকাবিলা করেছি করোনাও কাটিয়ে উঠব

তাজা খবর:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করি। মনুষ্যসৃষ্ট অগ্নিসন্ত্রাস থেকে শুরু করে নানাধরনের দুর্যোগও মোকাবিলা করেছি। করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগও কাটিয়ে উঠব। গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে করোনাভাইরাস মোকাবিলার কার্যক্রম সমন্বয় তদারকির অংশ হিসেবে সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের আটটি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন। গতকাল রংপুরই ছিল শেষ বিভাগ।

ভিডিও কনফারেন্সে রংপুর বিভাগের আটটি জেলার প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, ইমাম, ব্যাংকার, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন সংযুক্ত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনাভাইরাসের মতো এক অদৃশ্য শক্তির কাছে ধনসম্পদ, অর্থ কোনো কিছুই কাজে লাগছে না। অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে সীমিত আকারে ক্ষুদ্র শিল্প, হাটবাজার চালু করা হচ্ছে। ঈদের আগে কেনাকাটা করার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। তবে সুরক্ষা ও মানুষের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখতে হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশনা আসবে। তিনি বলেন, রোজার মাসে যাতে কেনাবেচা চলতে পারে, তার জন্য দোকানপাট খোলা, বাজারহাট চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় জেলাভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প চালানো যাবে। ধীরে ধীরে কিছু জিনিস উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানে সবাইকে নিজেকে ও অপরকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ১৫ মে পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষকে একেবারে ঘরে বন্দী না করে সীমিত অবস্থায় জরুরি কিছু কিছু কাজ চালাতে হবে। যাতে মানুষের কষ্ট না হয়। ঈদের আগে যদিও বড় জমায়েত করা যাবে না। সবাইকে যার যার মতো দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সবাইকে জরুরি কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার এ বক্তব্যে দেশবাসীকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগাম শুভেচ্ছা জানান।

চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শিগগিরই নির্বাচিত ৫ হাজার ৫৪ জন নার্স নিয়োগ দেওয়া হবে। যাঁদের করোনাভাইরাসের চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীসহ নিজ দলের নেতা-কর্মীদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের যারা সেবা দিচ্ছেন তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে শেখ হাসিনা বলেন, ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন বিভিন্ন ভাবে তাদের এই প্রণোদনা দেওয়া হবে। কৃষকের ধান কেটে ঘরে তুলে দেওয়ায় ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দুর্যোগে বিশেষ করে ছাত্রলীগ কৃষকের ধান কাটা ও করোনা প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা নিয়েছে। নিজের হাতে কাস্তে তুলে নিয়েছে। কৃষকের ধান কেটে ঘরে তুলে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের পাশাপাশি যুবলীগ, কৃষক লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও মাঠে নেমে পড়েছে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে তারা লাশ দাফন করছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন পুলিশ মারা গেছেন। তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া যাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সবাইকে ধন্যবাদ দেন তিনি। কয়েকজন মিডিয়াকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসার জন্য যাঁরা ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের দুই মাসের সুদ স্থগিত করা হয়েছে। ১০ টাকায় চাল কেনার জন্য আরও ৫০ লাখ রেশন কার্ড সুবিধা দেওয়া হবে। যাদের আয়-উপার্জনের পথ নেই, তাদের ঈদের আগে নগদ অর্থসহায়তা দেওয়া হবে। তিনি আবারও কৃষির ওপর জোর দিয়ে বলেন, এবার ২১ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হবে। আশা করি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে খাবারের সমস্যা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কুড়িগ্রাম ছিল কুঁড়েগ্রাম (অলসগ্রাম)। আমরা বলতাম কুঁড়েগ্রাম, চাইতেও জানে না। না রাস্তাঘাট, না কিছু। নদীতে পার হয়ে হয়ে যেতে হয়েছে। এখন তো ছয় ঘণ্টার মধ্যে চলে আসতে পারে, এ রকম ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি। কুড়িগ্রামের একটা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হবে, এটা আমারই আইডিয়া। আমি বলেছিলাম এটা করব, এটা হয়ে যাবে। আইন পাস করে দেব আমরা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হবে। কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, কুড়িগ্রাম খাদ্যে উদ্বৃত্ত, আমি খুব আনন্দিত। এটা ধরে রাখতে হবে। এখানে ফসল উৎপাদনটা বহুমুখী করতে হবে। চিলমারী বন্দরের কাজও আমরা শুরু করেছিলাম। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সব আটকে গেল। সেটাও হয়ে যাবে, নদীগুলো সব ড্রেজিং করা হবে। অনেক প্ল্যান নেওয়া আছে। রংপুর ও কুড়িগ্রামে যেন আর মঙ্গা ফিরে না আসে সেই আশাবাদ ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু এটা মঙ্গা পীড়িত এলাকা ছিল। এখানে যারা একটু সচ্ছল পরিবার আছে বা আমাদের জেলা প্রশাসন, দলীয় নেতা-কর্মী সবাইকে অনুরোধ করব, এ এলাকায় যেন আবার মঙ্গা ফিরে না আসে, সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেবেন। তিনি বলেন, রংপুর অঞ্চলে যদি দুস্থ লোক থাকে, তাদের সাহায্য করা আমাদের কর্তব্য। আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য মজুদ আছে। কোনো মানুষ যেন না খেয়ে কষ্ট না পায়। আর নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত অনেকেরই হয়তো কিছু অসুবিধা থাকতে পারে, যারা হাত পাততে পারে না, তাদের সহযোগিতার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিচ্ছি। কুড়িগ্রাম আরও উন্নত হোক। কুড়িগ্রামের মানুষ ভালো থাকুক। আর মঙ্গা যেন ফেরত না আসে। রংপুরে যেন মঙ্গা ফিরে না আসে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। পায়ে হেঁটে কুড়িগ্রামে যাওয়ার বর্ণনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নদীর পাড় ধরে কয়েক মাইল পায়ে হেঁটে সেই চিলমারী পৌঁছেছিলাম। রাজীবপুর গেছি, একটা রিকশাও নাই, এমন অবস্থা। ওখানে যাওয়ার কিছু নাই। সেখানে ব্রিজ করে দিয়েছি। আমি চাই কুড়িগ্রামের কুঁড়েমি দূর হয়ে কুড়িগ্রাম আরও উন্নত হোক। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাই মিলে আমরা যদি কাজ করি, আমাদের যে অগ্রযাত্রা সেটা অব্যাহত রাখতে পারব। কাজেই সেদিকে আপনারা সবাই মনে জোর রেখে কাজ করবেন। সমস্যা আসবে, সমস্যা মোকাবিলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ক্ষুদ্র চা চাষিদের সরকারের কৃষি প্রণোদনায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে স্থানীয় এক ক্ষুদ্র চা চাষি করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত কৃষি প্রণোদনায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঞ্চগড়ের চায়ের গুণগত মান অনেক ভালো। অনেকটা দার্জিলিংয়েরই মতো। পঞ্চগড়ের চা এরই মধ্যে নামও করেছে। তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের জন্য যে প্রণোদনা দিচ্ছি তাতে ক্ষুদ্র চা চাষিরা যাতে থাকে, তার ব্যবস্থা আমরা করে দেব। তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। চা বাগানের শ্রমিকদের আমরা আলাদাভাবে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে থাকি। বড় বড় চা বাগান যাদের আছে তারা তো অন্য রকম সুবিধা পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চায়ের চাহিদা বেড়ে গেছে। মানুষ চা খায় বেশি। করোনার কারণে এখন যেহেতু দোকানপাট বন্ধ এ জন্য চায়ের চাহিদা একটু কম। ভিডিও কনফারেন্সে রেলমন্ত্রীকে পণ্য পরিবহনে রেলকে সংযুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে আমরা রেল চালু করে দিয়েছি। পচনশীল পণ্য বা কোন এলাকায় বেশি উৎপাদন হয় এমন পণ্য যেন দ্রুত পরিবহন করা যায় তার জন্য রেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু চালু হয়েছে। তিনি বলেন, লাগেজ ভ্যান আমাদের যেটুকু আছে, সেটুকু সারা দেশ যুক্ত করে, আমরা পণ্য পরিবহনের এই সময়ে, যেহেতু সড়ক পরিবহন উন্মুক্ত হয় নাই, সুতরাং রেল সুযোগটা নিতে পারে। শুধু খাদ্যপণ্য নয় সব ধরনের পণ্য পরিবহন করতে হবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *