নিয়োগ বাণিজ্য কথন ও কিছু ভাবনা

নিয়োগ বাণিজ্য কথন ও কিছু ভাবনা

ড. জেবউন নেসা :

শুনলাম,একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষক নাকি চাকুরী প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা চেয়েছে।ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে সেই প্রেক্ষিতে তাদের কাছে আমার কিছু প্রশ্ন ঃ
১.আচ্ছা সম্মানিত শিক্ষক,আপনারা যখন শিক্ষক হয়েছিলেন,তখন কি এভাবে হয়েছিলেন?
২.আপনারা কি শিক্ষক নামের কলংক?
৩.আপনারা কি কখনো ভেবেছিলেন শিক্ষক হবেন?
৪.আমি নিশ্চিত,আপনারা কখনই ভাবেননি এত টাকা একসাথে দেখবেন,তাইনা ? কারন আপনারা সম্ভবত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান নন।
৫.আপনারা কি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আপনাদের বাপ দাদার সম্পদ মনে করেন?
৬.আপনারা কি মনে করেন,আপনাদের এই বিকারগ্রস্ততা কেউ জানবেনা?
জানি এই উত্তর আপনাদের কাছে নেই।
উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার পর্যবেক্ষণ
এ ধরনের মানুষগুলোর জন্য পুরো শিক্ষাব্যবস্থা আজ ধ্বংশের মুখে।
একটা ঘটনা শেয়ার করি,
কয়দিন আগে একজন নিয়োগ প্রার্থী সম্পর্কে কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার কাছে জানতে চান,প্রশাসনের বরাত দিয়ে।আমি সহজ সরল ভাবে সত্যি কথাগুলো সব বলে দেই।দেখা গেল, সে আমার কথাগুলো বিক্রি করে দিয়েছে অন্য কারো কাছে।আখেরে সেই বিতর্কিত প্রার্থীর চাকুরি ও হয়।পরে জানা গেল সেই ব্যক্তি প্রার্থীর লোক।এই ঘটনার পর থেকে এসব মুখোশধারি ব্যক্তির প্রতি আমার ঘেন্না জন্মে গেছে।

নিয়োগের আগে চাপ দেয়া,প্রার্থীর ঘুরাঘুরি, নানা হিসেব নিকেশ,নানা ষড়যন্ত্র, একে নিবো,তাকে নিবোনা।এ আমার লোক না,সে আমার লোক।এগুলি কি শিক্ষকতার মানদণ্ড হতে পারে?
একবার ও কি মনে হয়না এইসব মানুষের তাদের ছেলেমেয়ে ও এরকম সমস্যায় পড়তে পারে?
আর যারা এমন ভাবে শিক্ষক হয়,তারা কি কখনো শিক্ষক হতে পারে? হয় এরা “লাঠিয়াল” নয় এরা “ভোটার” হয়ে থাকে।
একজন শিক্ষক ৩৬ বছরের জন্য শিক্ষক হয়,সে যদি এমন ভাবে শিক্ষক হয়,তাহলে ৩৬ বছর তারমতই ছাত্রছাত্রী তিনি ম্যানুফ্যাকচার করবে।
আমি সহজ সরল পথে চলা মানুষ,পাঁচটি চাকুরী পেয়েছি,পাঁচ টাকা ও লাগেনি।
নীতিতে অটল ছিলাম,ধাক্কা খেয়েছি,হোচট খেয়েছি,কারো রোষানলে পড়েছি,তা ও নত হইনি।
শিক্ষকতা কি পন্য? শিক্ষকতা পেশা কি বিলাসিতা? শিক্ষকতা পেশা কি জীবনের নিরাপত্তা? কেউ কেউ পাশ করেই শিক্ষক হবার জন্য লাফ ঝাপ দিতে থাকে।কার কাছে থিসিস করলে শিক্ষক হবার বাসনা পূরন হতে পারে।সেটার হিসেব নিকেশ করে।এসব নোংরামি যতদিন থাকবে,শিক্ষকতা মহান পেশার খেতাবের যবনিকাপাত ঘটবে।
খ্যাতির জন্য নয়, সস্তা জনপ্রিয়তা নয়, দল ভারি করা নয়, স্বজনপ্রীতি নয়। দরকার নীতিবোধের।
গবেষণা করা, ভাল ক্লাশ নেয়া শিক্ষকের কাজ, এর কথা তার কাছে,তার কথা এর কাছে বিনিময় করা শিক্ষকের কাজ না। প্রভাবশালী শিক্ষকের পায়ের কাছে বসে থেকে অন্য শিক্ষকের বারোটা বাজানো শিক্ষকের কাজ না।
কে শিক্ষক হবে,কে হবেনা,এটা হিসাব করা শিক্ষকের কাজ না।টার্গেট করে শিক্ষার্থী বাছাই করে তাদেরকে শিক্ষক বানানোর অপপ্র‍য়াস করা শিক্ষকের কাজ না।ক্ষমতা দেখিয়ে কোর্সের নাম্বার কমিয়ে দেয়া,বাড়িয়ে দেয়া শিক্ষকের কাজ না।টানা হেঁচড়া করে প্রথম হবার যে যোগ্যই নয়,তাকে জোর করে প্রথম বানানো শিক্ষকের কাজ না।
শিক্ষার্থীদের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে দলভারি করা শিক্ষকের কাজ না।নারী শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করে নানা অশালীন কথা বলা শিক্ষকের কাজ না,শিক্ষক পছন্দসই নন, তাই সে শিক্ষকের শিক্ষার্থীর পিএইচডি কমিটি বাতিল করে, তত্তাবধায়কের সাথে কথা না বলে, নিয়ম ভংগ করে মন গড়া কমিটি গঠন করা শিক্ষকের কাজ না, নিয়োগ বোর্ডে বসে, এই প্রার্থী আমার গ্রুপের না,অন্য গ্রুপের এসব বলা শিক্ষকের কাজ না,শিক্ষার্থী নিয়ে নোংরা রাজনীতি করা শিক্ষকের কাজ না।সামনের সারির প্রার্থীদের বাদ দিয়ে পিছনের সারির প্রার্থীকে শিক্ষক বানানো শিক্ষকের কাজ না।
আমার এক সৌদি প্রবাসী বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল, কথা প্রসংগে বললাম, তুমি চাকুরী করতে পারো।সে বলল,এখানে মেয়েদের জন্য স্কুলে চাকরি ছাড়া অন্য চাকুরী বেশ কঠিন। আমি বললাম,স্কুলেই করো।সে বলল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে চাকুরি পেতে হলে প্রথম তিন বছর ভলান্টারি শিক্ষকতা করতে হয়।এরপর সহকারি শিক্ষক হতে পারব।
পাঠক, বুঝেন এবার বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়।আর এদেশে নাকি শুনতেছি ( জানিনা কতটুকু সত্য) কিছু কিছু সময় কিছু কিছু অর্থপিপাসু, যারা জীবনে টাকা চোখে দেখেনি,তারা নাকি টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা নামক মহান পেশা কেনা বেচা করে।
ছি,ছি, ছি,লজ্জা করেনা এদের,ছি।এতই দরকার টাকার, তাহলে তারা তাদের ভিটেমাটি বিক্রি করে ব্যবসা করলেই তো পারে।
বহু ঘটনা নিজের চোখে দেখছি,সব তো আর লেখা যায়না,উপর দিয়ে থুথু ফেললে নিজের উপর পড়ে।আমি ও তো শিক্ষক।তবে,বুক হাত দিয়ে বলতে পারি,শিক্ষক হতে এক কাপ চা ও কাউকে খাওয়াতে হয়নি।সাড়ে ছয় বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে শিক্ষক হয়েছি।কারো পিছে পিছে মেরুদন্ডহীনের মতো ঘুরতে হয়নি।বোর্ডে যে কয়জন প্রার্থি ছিল,সবার চেয়ে অভিজ্ঞতা,ডিগ্রি, রেজাল্ট সবকিছু একটু হলে ও বেশি ছিল,ব্যস চাকুরী হয়ে গেছে।
আমার কথা হচ্ছে,আমার যদি যোগ্যতা থাকে,তাহলে আমি কেন মানুষের পিছে ঘুরব।
সৎ ভাবে চাকরি পেয়েছি পাচ পাচটা।কারো কাছে নত হতে হয়নি।তাই মাথা উচু করে কথা বলতে পারি।কাউকে ভয় পাইনা,প্রয়োজন ও মনে করিনা ভয় পাবার।চেটে বড় হইনি,খেটে বড় হয়েছি।তাই ওত পেতে বসে থাকি,দুই নাম্বারি ধরার জন্য।যেখানেই দুই নাম্বারি দেখব এসব ব্যাপারে রুদ্রমূর্তি হয়ে দাড়িয়ে যাব।এসব নিয়োগ বানিজ্যের ছিটেফোটা ও যদি আমার চোখে পড়ে আমি তার লোভের জিভ টেনে মাটিতে পিষে দেব। এসব ছোটলোকগুলারে হাতের কাছে পেলেই কান টা ছিড়ে ফেলব।
শুরু করেছিলাম, সম্মানিত শিক্ষকের নিয়োগ বানিজ্য কাহন নিয়ে।
সম্মানিতরা যদি সত্যি এই কাজ করে থাকে।তাহলে এমনভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত,যেন এই ছোটলোকগুলো কোন দিন মাথা চাড়া দিতে না পারে,তাদের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা,এই কুচক্রী মহলের শিকড় বের করে জাতির সামনে প্রকাশ করে দেয়া
সময়ের দাবি।ছোটলোকগুলো যেন বুঝতে পারে,বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বাবার সম্পদ না।
এই এসব নরকের কিছু কীটের জন্য শিক্ষকতা নামক মহান পেশা কলুষিত হচ্ছে।বেশিরভাগ শিক্ষকবৃন্দই নীতি নিয়ে চলে।কিন্ত এক মন দুধে একফোটা চুন দিলে তো সব দুধই নষ্ট হয়।এসব কীট আজ জাতির কলংক,এরা জাতির শত্রু,এরা মীরজাফর,লোভী,চাটুকার,বেহায়া।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিন রাত পরিশ্রম করছেন সোনার বাংলা গড়ার জন্য, যা উনার একার পক্ষে সম্ভব না।আমি,আমরা সবাই মিলে দেশ গড়ার জন্য কাজ করতে হবে। তাই যেখানেই দুর্নীতি সেখানেই প্রতিবাদ করতে হবে।
সেবার মানসিকতা নিয়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে শিক্ষকতায় এসেছিলাম।যে আদর্শ বুকে ধারন করি,সেটা নিয়ে যেন শেষ দিন পর্যন্ত বেচে থাকতে পারি,এটাই আমার সাধনা।
নিপাত যাক,তারা যারা শিক্ষকতাকে পন্য মনে করে কেনাবেচার কাজে লিপ্ত হয়।এদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।এদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া এখন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।
শিক্ষা এবং শিক্ষকতা যদি হয় বানিজ্য,তাহলে পুরো জাতি ভেংগে পড়বে।
সর্বস্তরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া,নিয়োগ পদ্ধতির সংস্কার করা খুব প্রয়োজন।শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষায় শিক্ষক নিয়োগে যেহেতু দুর্নীতি,নোংরা রাজনীতির খেলা হয়,তাহলে সেই পদ্ধতির পক্ষে আমি নই।
এর কাছে গেলে সুবিধা হবে,তার কাছে গেলে সুবিধা হবে এই ধরনের চিন্তা যে পর্যন্ত প্রার্থীর মাথায় থাকবে,সে পর্যন্ত এ জাতি শিক্ষক পাবেনা।
তাই এই নিদারুণ নীতিহীনতা যখন চারিদিকে,তখন শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালার পরিবর্তন সময়ের দাবি।শুধু ভাল ফলাফল নয়,শিষ্টাচার, নীতিবোধ,ভদ্রতা,দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষক প্রয়োজন।
আজ শিক্ষক হয়ে কাল তার সরাসরি শিক্ষকের চোখে আংগুল দেখিয়ে কথা তখনই একজন শিক্ষক বলতে পারে,যখন শিক্ষক নিয়োগ হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এবং দলভারি করার অভিপ্রায়ে।
এ জাতি অন্ধ হয়ে যায়নি।আমি বিশ্বাস করি এখনো এ সমাজ পুরোটা নষ্টদের অধিকারে যায়নি।
নীতি এখনো বেঁচে আছে।সেই পথ ধরে হাঁটলেই সুদিন আসবে।
নইলে প্রচলিত প্রবাদ যা শিখেছি ছোটবেলা থেকে ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড “। এই প্রবাদ শুধু বইয়ের পাতায় থেকে যাবে। কোনদিন বাস্তবায়িত হবেনা।তখন জাতি শিক্ষাহীনতায় রুগ্ন হয়ে পড়বে।অচল হয়ে যাবে মানবিকতা। মুখ থুবড়ে পড়বে সকল স্বপ্ন।মগের মুল্লুক ভেবে যারা এগুলো করছে,তাদের বের করে এনে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা।কারন এদের মাধ্যমে ফাকফোকড় দিয়ে অযোগ্যরা শিক্ষক হয়ে প্রবেশ করলে,জাতি একদিন অযোগ্য হয়ে পড়বে।এই জাতিকে শক্তিশালী করতে চাইলে সর্বস্তরে নিয়োগ বাণিজ্য দূর করে,এসব কুচক্রী মহলকে চিহ্নিত করে জাতির সামনে হাজির করা সময়ের দাবি
তাই এখনই চিন্তায়,সংস্কার খুব জরুরি।

লেখক:
চেয়ারম্যান
লোক প্রশাসন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *