নৌকার দুর্গ

নৌকার দুর্গই থাকছে ঢাকা

তাজা খবর:

নবম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নৌকার দুর্গ হয়েই থাকছে ঢাকা জেলা। রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ জেলার ২০টি আসনের অধিকাংশতেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের জয়ের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ভোট বিশ্লেষকরাও এমনটাই মনে করছেন।

জানা গেছে, ঢাকা জেলার ২০টি আসনের মধ্যে ১২টি আসনে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হননি। ২০টির মধ্যে একটি আসনে (ঢাকা-১৮) সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় পার্টির জন্য ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ আসনে নৌকা প্রতীকের কোনো প্রার্থী নেই। তবে আওয়ামী লীগের নেতা আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। লাঙলের জন্য ছেড়ে দেওয়া এ আসন ছাড়া অবশিষ্ট ১৯টি আসনের মধ্যে ১৪টিতেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের জয়ের পথে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো প্রার্থী নেই। এসব আসনের নৌকা প্রার্থীরা তাই বলা যায় অনেকটাই নির্ভার। জেলার ৫টি আসনে নৌকার জয়ের পথে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

ঢাকা-১৮ আসনে সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিলেও জয়ের পাল্লা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকেই ঝুঁকে আছে বলে স্থানীয় ভোটারদের অভিমত। যদিও ১৯টি আসনেই ভোটে লড়ছে জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, তৃণমূল বিএনপি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ কংগ্রেস ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের প্রার্থীসহ আরও কিছু দল। এরপরও ঢাকায় নৌকার দুর্গ অভেদ্য থাকবে বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের ভাষ্য, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আবার সরকারবিরোধী পক্ষের আন্দোলন কর্মসূচিতে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে বিরোধীদের প্রধান লক্ষ্য রাজধানী ঢাকা। তাদের কর্মসূচি মোকাবিলার বিষয়টিও আওয়ামী লীগ মাথায় রেখেছে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার সময়।

জানা গেছে, ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ৮টিতেই বর্তমান এমপিদের নয়, অন্য নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন সানজিদা খানম (ঢাকা-৪), হারুনর রশীদ মুন্না (ঢাকা-৫), সাঈদ খোকন (ঢাকা-৬), সোলায়মান সেলিম (ঢাকা-৭), আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম (ঢাকা-৮), চিত্রনায়ক ফেরদৌস (ঢাকা-১০), ওয়াকিল উদ্দিন (ঢাকা-১১), জাহাঙ্গীর কবির নানক (ঢাকা-১৩) ও মাইনুল হোসেন খান নিখিল (ঢাকা-১৪)।

ঢাকা-১ আসনে নৌকার প্রার্থী সালমান এফ রহমান। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সালমা ইসলামসহ মোট ৬টি দলের প্রার্থী রয়েছেন। তবে এখনো পর্যন্ত এখানে নৌকার পাল্লাই ভারী বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

একইভাবে ঢাকা-২ আসনে নৌকার প্রার্থী কামরুল ইসলামের সামনেও তেমন চ্যালেঞ্জ নেই। যদিও সেখানে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. হাবিবুর রহমানসহ ইসলামী ঐক্যজোট ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছেন। ঢাকা-৩ আসনে নির্ভার নৌকার প্রার্থী নসরুল হামিদ। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আলী রেজাসহ জাতীয় পার্টি, মুক্তিজোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী থাকলেও নসরুল হামিদের বিকল্প নেই বলে মনে করা হচ্ছে।

দশম ও একাদশ নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসনটি মূলত আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিয়েছিল জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টিকে। দুই নির্বাচনেই জাতীয় পার্টির নেতা আবু হোসেন বাবলা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছে সানজিদা খানমকে। তিনি ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঢাকা-৪ আসনে আওয়ামী লীগে প্রার্থীর রয়েছে ব্যাপক চ্যালেঞ্জ। আসনটিতে আওয়ামী লীগের দুই ‘শক্তিশালী’ স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন। এর মধ্যে ট্রাক মার্কা প্রতীকে রয়েছে আওলাদ হোসেন ও ঈগল প্রতীকে মোহাম্মদ মনির হোসেন। বর্তমান সংসদ জাতীয় পার্টি নেতা সৈয়দ আবু হোসেন বাবলারও ‘বিশাল’ বলয় রয়েছে এ আসনে।

ঢাকা-৫ আসনে টানা তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান মোল্লা। ২০২০ সালে তিনি মারা গেলে এই আসনে উপনির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন কাজী মনিরুল ইসলাম মনু। এবার এই আসনে নৌকার প্রার্থী হারুনর রশীদ মুন্না। তার আসনেও চ্যালেঞ্জ অনেক। ওই আসনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতি কামরুল হাসান রিপন এবং আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার ছেলে সজল মোল্লা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি, তৃণমূল বিএনপিসহ আরও ৭টি দলের প্রার্থী এ আসনে লড়াই করছেন।

দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনটিতে জোটের প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছিলেন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ। এবার এই আসন থেকে সাঈদ খোকনকে প্রার্থী করেছে আওয়ামী লীগ। সাঈদ খোকন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে। তিনি নিজেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। এই আসনে সাঈদ খোকনের বড় কোনো প্রতিপক্ষ নেই। ঢাকা-৭ আসনে টানা দুই মেয়াদের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের হাজী সেলিম। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি নির্বাচন করছেন না এবার। তার জায়গায় প্রার্থী করা হয়েছে তার ছেলে মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিমকে। এই আসনেও তার শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ঢাকা-৮ আসনে গত তিন নির্বাচনে জোটসঙ্গী বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এবার আর জোটের জন্য আসনটি ছাড়েনি আওয়ামী লীগ। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে এ আসনে নৌকার প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি অনেকটাই নির্ভার।

ঢাকা-১০ আসনে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদে এমপি ছিলেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। পরে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য আসনটি ছেড়ে দেন। ২০২০ সালের উপনির্বাচনে ব্যবসায়ী নেতা শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনকে প্রার্থী করেছিল আওয়ামী লীগ। এবার এ আসনে দলটি প্রার্থী করেছে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদকে। তারও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

ঢাকা-১১ আসনে টানা দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের এ কে এম রহমতুল্লাহ। এবার এই আসনে প্রার্থী করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ওয়াকিল উদ্দিনকে। শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় তিনিও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। ঢাকা-১৩ আসনে এমপি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সাদেক খান। এবার দলের সভাপতিম-লীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে প্রার্থী করেছে আওয়ামী লীগ। নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি এ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ভোটের সমীকরণে তার অবস্থান খুবই ভালো বলে জানা গেছে।

ঢাকা-১৪ আসনে তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন আসলামুল হক। তার মৃত্যুতে ২০২১ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন আগা খান মিন্টু। এবার এই আসন থেকে প্রার্থী করা হয়েছে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে। তার শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে ভোটে আছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবিনা আক্তার তুহিন। নিখিলের পথের কাঁটা হিসেবে দেখা হচ্ছে তুহিনকে। এখানে এই দুই প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।

ঢাকা-১৫ আসনে কামাল আহমেদ মজুমদার নৌকার প্রার্থী। শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় তিনিও নির্ভার। তার আসনে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। যদিও এ আসনে আরও ৭টি দলের প্রার্থী রয়েছেন। ঢাকা-১৬ আসনে নৌকার প্রার্থী ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ্ একরকম ফাঁকা মাঠ পেয়েছেন। এ আসনে যদিও আরও ৫টি দলের প্রার্থী রয়েছেন, তবে তাদের কেউই প্রভাবশালী নন। নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী না থাকায় ঢাকা-১৭ আসনে নির্ভার আছেন নৌকার প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। ওই আসনে ৬টি দলের প্রার্থী থাকলেও আলী আরাফাতকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কেউ নেই।

ঢাকা-১৮ আসনটি সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয়েছে। এ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদেরের বিপরীতে আওয়ামী লীগের তিন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ আরও ৫টি দলের প্রার্থী রয়েছেন। এ আসনের বর্তমান এমপি মোহাম্মদ হাবিব হাসানের অনুসারীরা অবশ্য নীরব আছেন। অনেকে মনে করেন, হাবিব হাসান যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবেন, সে প্রার্থীই জয়ী হবেন। ঢাকা-১৯ আসনে নৌকার প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ এনামুর রহমান। এ আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ ও সাইফুল ইসলাম। এর মধ্যে তৌহিদ জং মুরাদকে এনামুর রহমানের শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঢাকা-২০ আসনে বেনজীর আহমদ নৌকার প্রার্থী। তার সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছেন এম এ মালেক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *