পঞ্চগড় এখন উন্নয়নের রোল মডেল

পঞ্চগড় এখন উন্নয়নের রোল মডেল

তাজা খবর:

.চা চাষে নীরব বিপ্লব

বিগত দেড় যুগ আগেও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া উত্তরাঞ্চলের একটি পশ্চাৎপদ জেলা ছিল পঞ্চগড়। তিনদিকে ভারত সীমান্ত বেষ্টিত এই জেলায় বছর ঘুরতেই নিম্ন আয়ের মানুষ আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গার শিকারে পরিণত হতো। চড়া সুদে মহাজনদের কাছে ঋণ নিয়ে অভাব অনটনে সংসারের বোঝা টানতে হতো। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল এবড়ো-থেবড়ো। উচ্চ শিক্ষার জন্য কলেজ থাকলেও উচ্চতর ডিগ্রীতে পড়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না। চিকিৎসাসেবা বলতে যৎসমান্য। সরকারী হাসপাতালে কদাচিৎ কোন ভাল চিকিৎসকের পোস্টিং হলেও এক মাস না যেতেই বদলি হয়ে চলে যেতেন। স্থানীয়দের অনেকেই বলতেন, পঞ্চগড় হলো চাকরিজীবীদের জন্য শাস্তিমূলক বদলির জায়গা। কৃষি এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা। নি¤œ আয়ের লোকজন নদীতে পাথর বালি উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করত। অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি হিসেবে পঞ্চগড় চিনিকল খানিকটা সহায়তা করত। অবস্থা সম্পন্ন কৃষকরা আখ চাষ করে আর্থিকভাবে সচ্ছলতার পথ খুঁজতেন। এক কথায় অর্থনীতির তলানিতে থাকা পশ্চাৎপদ জেলা হিসেবে সবাই নাক-সিটকাত। কালের বিবর্তনে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টিতে সেই পশ্চাৎপদ পঞ্চগড় এখন গোটা দেশে উন্নয়নের রোল মডেল। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই এসেছে আমূল পরিবর্তন। পঞ্চগড় এখন পুরনো পোড় খাওয়া অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পরিণত হয়েছে সচ্ছল একটি জেলায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে দেশে যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে তা থেকে পিছিয়ে নেই পঞ্চগড়ও। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়িত হয়েছে। আরও একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

১৪০৪ দশমিক ৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জেলায় উপজেলার সংখ্যা ৫টি। সংসদীয় আসন সংখ্যা দুটি। ইউনিয়ন পরিষদ ৪৩টি এবং পৌরসভা রয়েছে তিনটি। পঞ্চগড়-১ আসনের (পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া, আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে গঠিত) আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসাবে বর্তমান সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান দ্বিতীয় মেয়াদে এবং পঞ্চগড়- ২ আসনের (বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত) সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রী এ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারা উভয়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাকে শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যার ধারাবাহিকতায় পঞ্চগড়ের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই এসেছে আমূল পরিবর্তন। পঞ্চগড় এখন পুরনো পোড় খাওয়া অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পরিণত হয়েছে সচ্ছল একটি জেলায়। সমতলে চা চাষ জেলাটিকে সারাদেশে নতুন করে পরিচিত করে তুলেছে। রাজনৈতিক সংঘাত মুক্ত শান্ত জেলা পঞ্চগড়কে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড বলা হয়ে থাকে। জেলার মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা দেয়ার লক্ষ্যে পঞ্চগড় জেলা শহরসহ জেলার পাঁচ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৪শ’ সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখছে জেলা পুলিশ।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এখানে প্রকৃতি আর নির্মল বাতাসের সম্মিলন ঘটেছে ব্যতিক্রম রূপে। এছাড়াও হিমালয় পর্বতের সর্বোচ্চ চুড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে চায়ের চুমুকে দেখা যায় এ জেলা থেকে। তাই প্রতি বছর বিশেষ করে নবেম্বর থেকে পুরোটা শীতকালজুড়েই পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারী উদ্যোগে সমতলে চা চাষে ঘটেছে নীরব বিপ্লব। প্রতিবছর ১ কোটি কেজি উন্নতমানের চা উৎপাদিত হচ্ছে এ জেলায়। যা ইতোমধ্যে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার দখল করেছে। এছাড়া জেলায় দুটি পাটকল, বৈদ্যুতিক খুঁটির কারখানা, রেলের স্লিপার তৈরির কারখানা, ১৭টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাসহ একাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। এতে জেলায় কয়েক হাজার বেকার শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষিত বেকার ও শ্রমজীবী মানুষেরা নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়ায় আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গা শব্দটি এখন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁয় খুঁজে নিয়েছে।

মেগা প্রকল্প (এলজিইডি) ॥ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই জেলার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নেয়া হয়েছে অসংখ্য মেগা প্রকল্প। এসবের মধ্যে পঞ্চগড় থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ১৩২ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের মাধ্যমে ৮৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১৭.৪৬ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর আরও ৪৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮৪.৭০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া ৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১০ মিটার ব্রিজ ও কালভার্টের কাজ শেষ হয়েছে। আরও ১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১৬ মিটার ব্রিজের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া জেলার ৩১৭ কিলোমিটার সড়ক মেরামতে ৯৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

১০৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বিলুপ্ত ছিটমহলে পাকা সড়ক, কমিউনিটি সেন্টার, খাল পুনঃখননসহ ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করা হয়েছে। ১০০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯৯.৪৫ কিলোমিটার সড়ক মেরামত কাজ চলমান রয়েছে এবং একই সঙ্গে সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ করা হচ্ছে মর্মে পঞ্চগড় এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শামছুজ্জামান জানিয়েছেন।

মেগা প্রকল্প (সড়ক ও জনপথ) ॥ সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প-০২ এর আওতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধা জাতীয় মহাসড়ক এবং বোদা-দেবীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ সরকার ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ৫৩.১০ কিলোমিটার পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা জাতীয় মহাসড়কটির নির্মাণ ব্যয় হয় ১শ’ ৮৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এছাড়াও ২৬.৩০ কিলোমিটার বোদা-দেবীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কটির নির্মাণ ব্যয় হয় ৮৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

এছাড়াও পঞ্চগড় চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেট আদালত ভবন, নার্সিং ইনস্টিটিউট, কারিগরি প্রশিক্ষণ একাডেমি, পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়ায় মডেল মসজিদ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় নির্মাণ, বোদা ফায়ার সার্ভিস অফিস, বোদা পৌরসভা ভবন, পাওয়ার গ্রিড স্টেশন, তেঁতুলিয়ায় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর রেস্ট হাউস এবং জেল পরিষদের অর্থায়নে ডাকবাংলো নির্মাণ, পিকনিক কর্নারের উন্নয়ন ও পর্যটকদের জন্য মহানন্দা নদী তীরে ওয়াক ওয়ে স্থাপন করা হয়েছে। জেলার স্কুল কলেজের আধুনিক ভবন নির্মাণসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং অনেক প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। পঞ্চগড় সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ভবন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে মর্মে সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রে জানা গেছে।

আলু বীজ সংরক্ষণাগার ॥ স্থানীয় কৃষকদের উন্নতমানের বীজ আলু সরবরাহের জন্য পঞ্চগড় শহরের ধাক্কামারা এলাকায় পুরনো বিএডিসি গোডাউনের পাশে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি হিমাগার নির্মাণ করা হয়। এছাড়াও পঞ্চগড় সদর উপজেলায় সরকারীভাবে ৩৫০ একর জমিতে উন্নত জাতের আলু বীজ খামার স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বাফার সার গোডাউন ॥ জেলার বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউপির আরাজী গাইঘাটা এলাকায় ২৭ কোটি ৪৯ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন বাফার সারের গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে।

আধুনিক মানের রেলপথ ॥ পঞ্চগড় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন থেকে পার্বতীপুর ১৩২ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হয়েছে। এর আগে এ রেলপথটি কোন রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। প্রতিদিন পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড় একটি লোকাল ট্রেন চললেও রেলপথের করুণ অবস্থায় সেটিও লাইনচ্যুত হয়ে দিনের পর দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রেলপথেও এসেছে অভাবনীয় সফলতা। রেলপথ উন্নয়নের পাশাপাশি বর্তমানে পঞ্চগড়-ঢাকা রেলপথে তিনটি ও পঞ্চগড়-রাজশাহী রেলপথে একটি আধুনিক মানের আন্তঃনগর ট্রেন নিয়মিত চলাচল করছে। একই সঙ্গে দুটি মেইল ট্রেন ও একটি ডেম্যু ট্রেন নিয়মিত চলাচল করছে। পঞ্চগড় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশনকে আধুনিকায়ন করতে উন্নয়নমূলক কাজসহ প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে।

পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা রেলপথ প্রকল্প ॥ পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে জগদল, ভজনপুর, তেঁতুলিয়া, তিরনইহাট ও বাংলাবান্ধায় স্টেশন নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে চারটি ব্রিজ ও ১৪টি কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। তার আগে ৮৬০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সম্প্রসারিত এ রেলপথের সমীক্ষা ও নক্সার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ রেলপথটি চালু হলে জেলায় ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এতে অর্থনীতির দৃশ্যপট একেবারে পাল্টে যাবে। একই সঙ্গে ভারতের শিলিগুড়ির সঙ্গে রেলপথ যোগাযোগ আরও সহজতর হবে। পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ হলে চার দেশের সংগে ব্যবসা-বাণিজ্যের দুয়ার খুলে যাবে।

এ প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী এ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন এমপি জনকণ্ঠকে বলেন, রেল যোগাযোগের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এবং সারাদেশে রেলপথকে ঢেলে সাজাতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে ট্রেন যোগাযোগ আরও আধুনিক ও আকর্ষণীয় করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সকল নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারিত করা হলে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ বহুমাত্রিক সফলতা অর্জন সম্ভব হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ॥ দেশের নদ-নদী ও পরিবেশ রক্ষায় ডেল্টাপ্লান ২১০০ জেলার ৫টি নদী ও একটি খাল খনন করার প্রকল্প নেয়া হয়। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এরই মধ্যে ৪টি নদী ও একটি খাল খননের কাজ শেষ হয়েছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানিসম্পদের সুষম বণ্টন, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনায় নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন ও পানির চাহিদা পূরণ এবং টেকসই উন্নয়ন, ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনরুজ্জীবিত করায় কৃষি ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

পঞ্চগড় পৌরসভা ॥ ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে পঞ্চগড় পৌরসভার ময়লা আবর্জনা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিশোধন করার জন্য স্যানেটারি ল্যান্ডফিল্ড প্রকল্পের কাজ ও পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল বিশিষ্ট পৌর মার্কেটের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌরসভা এলাকার ৬টি বস্তি উন্নয়নের কাজও চলমান রয়েছে। পৌর মেয়র জাকিয়া খাতুন জনকণ্ঠকে বলেন, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার জন্য যেসব নাগরিক সুবিধা প্রয়োজন তা পর্যায়ক্রমে করা হবে।

বিলুপ্ত ছিটমহলের উন্নয়ন ॥ প্রধানরমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন দীর্ঘদিন ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ হিসেবে বেঁচে থাকা ছিটমহলে বসবাসের মানুষের স্থায়ী ঠিকানা দিয়ে। ঐতিহাসিক ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আওতায় ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে জেলার ৩৬টি ছিটমহলের মানুষ এদেশের নাগরিকত্ব পাবার সুযোগ পেয়েছেন। ছিটমহল সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৭৪ সালে ইন্দ্রিরা-মুজিব চুক্তি হলেও কোন সরকারই বিষয়টি গুরুত্ব না দেয়ায় সেখানে বসবাসরতরা দুর্বিষহ জীবনযাপন করেছে। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘বিশ্ব মানবতা রক্ষায়’ ছিটমহল বিনিময় বিষয়ে বোঝাতে সক্ষম হন। যার ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ঐতিহাসিক এ দিনে তারা পেয়েছে স্বাধীনতার সুখ। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনার শিকার বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষের ঘরে ঘরে জ্বলছে এখন বৈদ্যুতিক বাতি। ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক সরকারী-বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চাষের জমির সেই সরু পথ এখন পাকা সড়কে রূপান্তরিত হয়েছে। সেখানে থাকা মানুষদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষার পাশাপাশি আয়মূলক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গৃহহীনদের জন্য তৈরি করা হয়েছে আধুনিক মানের আধাপাকা ঘর।

দেবীগঞ্জে গড়ে উঠছে অর্থনৈতিক অঞ্চল ॥ জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবীডুবা ও সোনাহার ইউনিয়নে প্রস্তাবিত ৬০২ দশমিক ৪২ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে খাস খতিয়ানভুক্ত ২১৭ দশমিক ৭৮ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য লিজ গ্রহণ করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে বেজা। এরই অংশ হিসাবে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলাতেও গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। এতে ১০ হাজার দক্ষ-অদক্ষ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যপণ্য, গার্মেন্টস, সাইকেল-মোটরসাইকেল উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করা হবে। এতে জেলার শিল্প বিকাশের পাশাপাশি আর্থসামাজিক উন্নয়ন সাধিত হবে। সেইসঙ্গে পঞ্চগড় জেলায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত হবে।

চায়ের নরম সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে তেতুঁলিয়া ॥ একসময় পঞ্চগড়কে বলা হতো পাথুরে শহর। কী সমতল, কী নদী সব খানেই পাথর আর পাথর। বেলে দো’আশ মাটি হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় কৃষকরা আমন ধান চাষ করত এসব জমিতে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ পতিত পড়ে থাকত। পতিত পড়ে থাকা সেই জমিগুলো যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হতো গো-চারণ ভূমি হিসেবে। দীর্ঘদিনের সেই পতিত পড়ে থাকা জমি এখন চায়ের নরম সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে। এখানে উৎপাদিত চা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দার্জিলিংয়ের চায়ের মতো উৎকৃষ্ট মানের হওয়ায় দেশব্যাপী চাহিদা যেমন বেড়েছে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তার ফসল পঞ্চগড়ের সমতলে চা চাষ। অনেকদিন আগের কথা নয়। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চগড় সফরে আসেন। সফরে এসে পঞ্চগড়ের পার্শ¦বর্তী ভারতীয় সীমান্তজুড়ে চায়ের বাগান ও ভারতের দার্জিলিংয়ে চায়ের বিষয়ে কথা বলার ফাঁকে পঞ্চগড়ে চা চাষের সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা হয় তৎকালীন জেলা প্রশাসক রবিউল ইসলামের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে জেলায় ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি বিশেষজ্ঞ দল উত্তরাঞ্চল সফর করেন। বিশেষজ্ঞ দলটি জেলার মাটি পরীক্ষা করে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও এলাকার মাটিতে চা চাষ সম্ভব বলে মতামত তুলে ধরেন। ২০০০ সালের কথা। চা চাষে এগিয়ে আসে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি নামে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি এলাকায় প্রথম ছোট্ট একটি চা বাগান করেন। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের অনুরোধে জেমকন গ্রুপ কাজী এ্যান্ড কাজী টি এস্টেট নাম দিয়ে বড় আকারে চা বাগান করেন। তাদের দেখাদেখি বেশ কিছু উদ্যোক্তা ছোট ও বড় আকারের বাগান পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে পতিত জমিতে চা চাষ শুরু করেন। সেই থেকে সমতল ভূমিতে চা চাষের শুরু। ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে চা বাগানের পরিধি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাগানও সম্প্রসারিত হয়। তখন থেকে আস্তে আস্তে করে বাণিজ্যিকভাবে ও ক্ষুদ্র পরিসরে সমতল ভূমিতে বাড়তে থাকে চা চাষের পরিধি। পঞ্চগড়ের চা বাগানকে ঘিরে ২০০১ সালে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের উন্নয়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ চা বোর্ডের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) একটি উপকেন্দ্র স্থাপন করে সরকার। পরবর্তীতে যা আঞ্চলিক কার্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্য অবদান পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধায় স্থলবন্দর নির্মাণ। জেলার অর্থনীতিতে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেই চলেছে। যাত্রাপথের শুরুতে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের অভ্যন্তরীণ সড়ক ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য করলেও বর্তমানে বন্দরটিতে যুক্ত হয়েছে ভারত ও ভুটান। এর ফলে বন্দরটি চতুর্দেশীয় স্থলবন্দরে রূপান্তরিত হয়েছে। চতুর্দেশীয় আন্তর্জাতিক লেনদেন করে এরই মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি গত ১ সেপ্টেম্বর ২৪ বছর পেরিয়ে ২৫ বছরে পদার্পণ করেছে।

১৯৯৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেপাল-বাংলাদেশের মধ্যে ভারতীয় সড়ক ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম শুরু হয়। তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ বন্দরটি উদ্বোধন করেন। এর পর থেকেই বন্দরের সফলতা বেড়েই চলেছে। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ ও ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বন্দরটিতে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। উভয় দেশের সম্পর্কের সেতুবন্ধনটিও বর্ণাঢ্যভাবে উদ্বোধন করা হয়। ভারতের ফুলবাড়ি স্থলবন্দরে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন ভারতের অর্থমন্ত্রী পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ প্রয়াত প্রণব মুখার্জী এবং বাংলাবান্ধায় বাংলাদেশের তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দরটি উদ্বোধন করেন। এর পর বন্দরটিতে যোগ হয় ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সেতুবন্ধন।

বন্দরের বার্ষিক বিবরণী সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বন্দরটিতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩৩ কোটি টাকা। যার বিপরীতে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬১ কোটি টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল এ তিন মাসে বন্দরটি দিয়ে ভারত থেকে ৩৮ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়। যার আমদানি মূল্য ১শ’ ৩১ কোটি টাকা। এ খাত থেকে সরকারী রাজস্ব আয় হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের দুই যুগ পূর্তিতে বন্দরটির এমন রাজস্ব আয় নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার মবিন-উল-ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে রফতানি করা হচ্ছে পাট ও পাটজাত পণ্য, চাল, আলু, ব্যাটারি, কোমল পানীয়, গার্মেন্টস সামগ্রী, ক্যাপ, হ্যাঙ্গার, সাবান, বিস্কুট, চানাচুর, জুস, কাচসহ বিভিন্ন দ্রব্য। আমদানি করা হচ্ছে পাথর, বিভিন্ন মেশিনারিজ, ডাল, চাল, ভুট্টা, প্লাস্টিক দানা, আদাসহ বিভিন্ন পণ্য। এছাড়া বন্দরটিতে ভারতের সঙ্গে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু থাকায় সহজে উভয় দেশের লোকজন ব্যবসা, চিকিৎসা, ভ্রমণসহ বিভিন্ন কাজে যাতায়াত করার সুযোগ পেয়েছে।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের সিএ্যান্ডএফ এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পঞ্চগড় চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রেজাউল করিম রেজা বলেন, স্থলবন্দরটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সহজেই আমদানি-রফতানি করার সুযোগ রয়েছে যা দেশের অন্য কোন বন্দরে নেই। বন্দরটির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক স্থাপন করা গেলে দেশের রাজস্ব আয় আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় স্থলবন্দরে পরিণত হবে বাংলাবান্ধা। সুযোগ সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের।

বন্দরের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা মানুষের আস্থা অর্জন করেছে ॥ ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বন্দরটিতে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়। বন্দরটি থেকে ভারতের শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, সিকিম এবং নেপাল ও ভুটান বেশ কাছে হওয়ায় ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা নেয়ার জন্য উভয় দেশের লোকজন এ বন্দরটি ব্যবহার করছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এ ইমিগ্রেশন দিয়ে ১ লাখ ৮১ হাজার ৬৩১ জন যাত্রী পারাপার করেছে। সবচেয়ে বেশি যাত্রী পারাপার করেছেন ২০১৯ সালে। এ বছর ভারত, নেপাল ও ভুটানে ৮১ হাজার ৮৮৭ জন যাত্রী পারাপার করেন। বৈশ্বিক করোনা মহামারী না হলে এ সংখ্যা চলতি বছরে দ্বিগুণ হতো বলে স্থলবন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে বদলে গেছে ২ হাজার ৪১৬ পরিবারের জীবনমান ॥ কেউ থাকত অন্যের বাড়িতে আবার কেউ অন্যের জায়গায় বা খাসজমিতে। তাদের ছিল না কোন স্থায়ী ঠিকানা। জেলায় এমন দুই হাজার ৪১৬টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারের ঘর দেয়া হয়েছে। এসব ঘর পেয়ে বদলে গেছে সুবিধাভোগীদের জীবনমান। এই সুবিধার আওতায় এসেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীরাও। মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষে পঞ্চগড়ের পাঁচ উপজেলায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে এই ঘরগুলো করা হয়। প্রত্যেকটি ঘরে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহারের এই ঘরগুলো পেয়ে হাসি ফুটেছে একসময়ের ছিন্নমূল, আশ্রয়হীন এবং দুর্ভোগ পোহানো মানুষগুলোর। মানবেতর জীবনযাপন থেকে মুক্তি পেয়ে এখন তারা নিরাপদ, টেকসই ও মজবুত পাকা ঘরে পরিবার পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষে নির্মাণকৃত পঞ্চগড়ে দুই হাজার ৪১৬টি ঘরের মধ্যে বিলুপ্ত সিটমহলবাসীদের মধ্যে পেয়েছে ১৩০টি পরিবার এবং ১২০টি ঘর পেয়েছে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী পরিবার। অবশিষ্ট ঘরগুলো পেয়েছে ভূমিহীন ও গৃহহীন অসহায় পরিবারগুলো।

জেলা প্রশাসক মোঃ জহুরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহারের এই ঘরগুলো স্ব-স্ব উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের মাধ্যমে ঘরের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। ইতোমধ্যে যারা ঘর পেয়েছেন তারা আনন্দে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন বলে তিনি জানান।

পর্যটক টানতে বাংলাবান্ধায় হচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার ॥ তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধায় নির্মিত হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্কয়ার’। টুইন টাওয়ার কিংবা লন্ডন ব্রিজের আদলে দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনাটি মহাসড়কের দুই পাশে থাকবে ৫ তলার দুটি ভবন। ভবন দুটি যুক্ত হবে একটি সেতুর মাধ্যমে। সম্পূর্ণ স্থাপনাটি হচ্ছে স্টিল স্ট্রাকচারের। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সুবিধার্থে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। নান্দনিক এই স্থাপনা নির্মাণ করছে পঞ্চগড় জেলা পরিষদ। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, প্রতি বছর ৫০ হাজারের বেশি পর্যটকের আগমন ঘটে এই জেলায়। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে পর্যটক আকৃষ্ট করতে তেমন কোন অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা নেই। তাই পর্যটক টানতে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এলাকায় মহাসড়কের দুপাশে স্টিল স্ট্রাকচারের দুটি পাঁচ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই পাঁচ তলা ভবনের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট এবং প্রস্থ ৩০ ফুট হচ্ছে। প্রথম ভবনের নিচতলায় থাকবে জাদুঘর। সেখানে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিসহ ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সম্পাদিত সব চুক্তির ছবি এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংক্রান্ত তথ্য চিত্র রাখা হবে। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলায় থাকবে আবাসিক সুবিধা। পঞ্চম তলায় থাকবে ওয়াচ টাওয়ার ও কফি কর্নার। দ্বিতীয় ভবনের নিচতলায় থাকবে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও সিকিউরিটি ইউনিট। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলায় থাকবে আবাসিক সুবিধা। পঞ্চম তলায় হবে ওয়াচ টাওয়ার ও খাবার হোটেল। দুটি ভবনকে ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের একটি সেতু সংযোগ স্থাপন করবে। সেতুটি নির্মিত হবে মাটি থেকে ২৫ ফুট ওপরে। সেতুটির মাঝ বরাবর ৫ ফুট চওড়া একটি রাস্তা রেখে দুই পাশে থাকবে দেশের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর স্টল। সরকারের অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানের স্টলও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্কয়ার নির্মিত হলে পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। পর্যটকদের থাকা খাওয়াসহ বিনোদনের সুযোগ তৈরি হবে।

পঞ্চগড় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদাত সম্রাট জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক পঞ্চগড়ে ঘুরতে আসেন। বিশেষ করে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট দেখতে যান তারা। কিন্তু সেখানে থাকা খাওয়ার তেমন কোন সুযোগ সুবিধা নেই। পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতেই আমরা জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্কয়ার’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করি এটি নির্মিত হলে পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

দর্শনীয় স্থান : মহারাজার দিঘী, আটোয়ারীর মির্জাপুরে মোঘল আমলে নির্মিত শাহী মসজিদ, ঈমামবারা, বার আউলিয়া মাজার, বোদেশ্বরী মন্দির, তেঁতুলিয়ার ঐতিহাসিক ডাকবাংলো প্রভৃতি।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রেম চিরকালীন। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য মানুষকে বিভোর করে বলেই প্রকৃতি ও জীবন একাকার হয়ে থাকে আজীবন। প্রকৃতির বিচিত্র সব আয়োজনের মধ্যে আবার বিশেষ কিছু অঞ্চল বা এলাকা আছে যা মানুষকে চুম্বক শক্তির মতোই আকর্ষণ করে। আর এই আকর্ষণের টানেই মানুষ পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে চলেছে। পঞ্চগড়কে বলা হয় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের জেলা। সমতলের চা বাগানের সবুজ সতেজ চা পাতা আর স্থাপত্য শিল্প যেন প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন করে অপরূপ রূপে সেজে সেই আহ্বানই জানাচ্ছে পঞ্চগড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *