সেতু দৃশ্যমান ৩১ স্প্যান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতু দৃশ্যমান ৩১ স্প্যান

তাজা খবর:

দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেল সেতুর কাজ। ইতোমধ্যে সেতুর ৩১টি স্প্যান দৃশ্যমান হয়েছে। সম্পন্ন হয়েছে সেতুর নির্মাণ কাজের ৭৬ শতাংশ। সেতুর ৫০টি সুপার স্ট্রাকচার বা স্প্যানের মধ্যে বসানো হয়েছে ৩১টি। আগামী মার্চের মধ্যে সব স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হবে।

দেশের সবচেয়ে বড় ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনের রেল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে যমুনা নদীর ওপর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু বাংলাদেশে এটাই প্রথম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনের রেল সেতু। এর আগে ব্রিটিশ আমলে পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার অসম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ সহজতর করার লক্ষ্যে পদ্মা নদীর ওপর এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়।

দীর্ঘ ১০১ বছর পর যমুনা নদীতে এই প্রথম নির্মাণ করা হচ্ছে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনে রেল সেতু। ইতোমধ্যে রেল সেতুটির ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে এর আগেই ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে রেল সেতু নির্মাণ কাজ শেষ বলে প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা জানান।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সাবরুট ও আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে যমুনায় বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনে নির্মাণ করা হচ্ছে রেল সেতুটি। বঙ্গবন্ধুর সেতুতে রেল চলাচলে সমস্যার কারণে ২০১৪ সালে পরিকল্পনা নেয়া রেল সেতু নির্মাণে। বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০০ মিটার উজানে ৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলসেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর দুই বছর পর ২০১৬ সালে একনেক সভায় অনুমোদন হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্প’।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৭৬ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫৮ শতাংশ। ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় প্রকল্পটি নির্মাণ করা হচ্ছে জাপানি অর্থায়নে। এর মধ্যে জাইকা অর্থায়ন করছে ১২ হাজার ১৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। বাকি ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে জিওবি ফান্ড থেকে। এই রেল সেতুটি বাস্তবায়ন হলে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন সংখ্যা বাড়বে। নতুন সেতু দিয়ে দৈনিক ৬০ শতাংশ যাত্রীবাহী যান চলাচল বাড়ানো যাবে। রেল সেতুটির ওপর দিয়ে দৈনিক ৮৮টি ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩৮টি ট্রেন ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার গতিতে বঙ্গবন্ধু সেতু পারাপার হয়। এতে অনেক সময়ের অপচয়ের পাশাপাশি ঘটছে সিডিউল বিপর্যয়। বাড়ে যাত্রী ভোগান্তি। এসব সমস্যা সমাধানে বর্তমান সরকার যমুনা নদীর ওপর আলাদা একটি রেল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। পৃথক রেল সেতু হলে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলে গতিবেগ বাড়বে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। এতে রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসতে সময় অনেকটাই কমে আসবে। এ ছাড়া কন্টেনার ট্রেন চলবে ৮০ কিলোমিটার গতিতে। আর পণ্য পরিবহন বাড়ানো যাবে ১৬০ শতাংশ। ফলে দৈনিক মালবাহী ট্রেনে সাড়ে ৩২ টন পণ্য পরিবহন করা যাবে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

মার্চ শেষ হবে সেতুর স্প্যানের কাজ ॥ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুটি দুটি প্যাকেজে নির্মাণ করা হচ্ছে। দুই অংশে আলাদাভাবে নির্মাণ করছে জাপানের দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সেতুটির পূর্ব অংশে ডব্লিউডি-ওয়ান প্যাকেজ নির্মাণ করছে যৌথভাবে জাপানের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ওবায়শি করপোরেশন, টিওএ করপোরেশন এবং জেএফই। এই অংশের জন্য ব্যয় হবে ৬ হাজার ৮০১ কোটি টাকা। এ ছাড়া সেতুর পশ্চিমাংশে ডব্লিউডি-টু প্যাকেজ যৌথভাবে নির্মাণ করছে জাপানের অপর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠার আইএইচআই এবং এসএমসিসি। এই অংশের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।

বঙ্গবন্ধু সড়ক সেতুর সমান্তরালে ৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ নির্মাণ করা হচ্ছে রেল সেতুটি। সেতুর উভয় প্রান্তে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট (উড়াল পথ) নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ৭ দশমিক ৬৬৭ কিলোমিটার এপ্রোচ ও লুপ লাইনসহ মোট ৩০ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হবে। সেতুর ৫০টি পিয়ার (খুঁটি) পিয়ার নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৩টি পশ্চিমাঞ্চলে, বাকি ২৭টি পূর্বাঞ্চলে পড়েছে। উভয় অংশে ৪৩ পিয়ারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায় রয়েছে।

এর মধ্যে ডব্লিউডি-১ প্যাকেজের আওতায় ২৪-৫০ নম্বর পিয়ারের মধ্যে ২৭টি পিয়ারের সব নির্মাণ শেষ হয়েছে। ডব্লিউডি-২ প্যাকেজের আওতায় ১ থেকে ২৩ নম্বর পিয়ারের মধ্যে ১৬টি পিয়ার নির্মাণ শেষ হয়েছে। সেতুর অবশিষ্ট ৭টি পিয়ার নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২২ সালের ২ সেপ্টেম্বর সেতুর ৪৭-৪৮ নম্বর পিয়ারে (খুঁটিতে) বসানো হয়েছে প্রথম স্প্যান। বঙ্গবন্ধুর রেল সেতুর স্প্যানগুলো ভিয়েতনামে তৈরি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৫টি স্প্যান প্রকল্প এলাকায় আনা হয়েছে।

প্রতিটি স্প্যানের প্রস্থ ১৬ মিটার, দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার ও উচ্চতা ১১ মিটার। প্রতিটি স্প্যানের ওপর জাপানিদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির রেললাইন বসানো হচ্ছে। ফলে সেতুর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। সেতুর ৫০টি পিয়ারের ওপর ৪৯টি স্প্যান (ইস্পাতের কাঠামো) বসানো হবে। এ ছাড়া সেতুর উভয়প্রান্তের দুই স্টেশনে সিগন্যালিং সিস্টেম স্থাপনে ডব্লিউডি-৩ নামে অপর একটি প্যাকেজের কাজও চলছে। সেতুটি নির্মাণে জাপান, ভিয়েতনাম, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপিন্স ও বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কর্মী নিয়োজিত রয়েছে বলে প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা জানান।

এ বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক আল ফাত্তাহ মাসউদুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ‘যমুনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৬ শতাংশ। ইতোমধ্যে প্রকল্পটি ৫০টি সুপার স্ট্রাকচার বা স্প্যানের মধ্যে ৩১টি বসানো হয়েছে। আগামী মার্চের মধ্যে সব স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হবে। এরপর রেলপাত বসানোসহ অন্যান্য কাজ করা হবে। তাই ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হবে।

এই প্রকল্পের আওতায় বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তের রেলস্টেশন ভবন আধুনিকায়ন করা হবে। এ ছাড়া স্টেশনের সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থার আরও উন্নত করা হবে।’ পাশাপাশি সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অফিস ও আবাসন এবং একটি জাদুঘর নির্মাণ করা হবে বলে জানান তিনি।

ব্যয় তিন দফা ও সময় এক দফা বৃদ্ধি ॥ প্রকল্প অনুমোদনের চার বছর পর ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর রেল সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ সেতুটি নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথাছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। তা সম্ভব না হওয়ায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০২০ সালের মার্চে সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন হয়। তবে এক বছর আগেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্টরা জানান।

প্রায় ৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হবে ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) বাকি ৪ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। ২০১৪ সালে প্রকল্পের ডিপিপি তৈরির সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। ওই বছর ডিসেম্বরে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার সময় ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার ২৭৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে একনেকে অনুমোদনের সময় প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় আরও ৭ হাজার ৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। সময় এক দফা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *