বস্তিবাসীর আনন্দ : কড়াইলে গণটিকা

বস্তিবাসীর আনন্দ : কড়াইলে গণটিকা

তাজা খবর:

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে রাজধানীর বস্তিগুলোতে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার রাজধানীর সবচেয়ে বড় বস্তি মহাখালীর কড়াইলে উৎসবমুখর পরিবেশে বস্তিবাসীদের প্রথম দিনের টিকাদান কার্যক্রম চলে। সকাল ৯টায় শুরু হয়ে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। টিকা পেয়ে বস্তিবাসীর চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ঢেকুর। তাদের অনেকেই হাসিমুখে বের হয়ে বলেন, ‘ঈদের মতো আনন্দ লাগছে’।

এদিন সকাল থেকে ভোটার আইডি কার্ড কিংবা জন্মসনদ দিয়ে নিবন্ধন করে করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়া শুরু করেন কড়াইল বস্তির বাসিন্দারা।

পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের বস্তিতে তা সম্প্রসারিত হবে। প্রতিদিন এই বস্তিতে মোট ২৫টি বুথে ১০ দিনব্যাপী এই কর্মসূচি চলবে বলেও জানা গেছে।

সরেজমিন পল্লীবন্ধু এরশাদ শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা যায়, টিকা পেতে বস্তিবাসীদের অনেকেই ভোর থেকে অপেক্ষা করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন গার্মেন্টস কর্মী, গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও দিনমজুর। তবে টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। টিকা নিতে আসা অধিংকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক ও শারীরিক দূরত্বের কোনো বালাই ছিল না বললেই চলে। তবে বস্তিতেই টিকা পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন বস্তিবাসীরা।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, কড়াইল বস্তিতে প্রথম দিন ৬ হাজার ৩২১ জনকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বস্তির ১১টি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে বস্তির অন্তত ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। ১৮ বছরের বেশি বয়সি যে কেউ এসব কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নিতে পারবেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে বস্তিবাসীকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলেও জানানো হয়।

বস্তির বাসিন্দা পেয়ারা বেগম জানান, আগে কয়েকবার কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়ার জন্য খুব ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও টিকা পাননি।

তিনি বলেন, ‘আগে চারবার ঘুইরা গেছি। তহন শুনি গণটিকা দেওয়া হচ্ছিল। পরে নিবার পারি নাই। এহন নিজেগো বস্তিতেই করোনা টিকা দেওয়া হইতেছে। এইডাই এহন খুশির খবর!’

কাজ থেকে ছুটি নিয়ে সকাল হতে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকা নিয়েছেন অনেকেই। তাদের একজন রাহেলা খাতুন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি কি প্রতিদিনই আসব? কাজকাম ফেইল্যা আজ টিকা নিতে এসেছি। সকাল সাট্টা থেকে এসে বসে আছি। মহাজন আমারে ফোন দিয়া বলে আমি নাকি মিছা কথা কইতেছি।’

মোস্তফা করিম নামে একজন বলেন, ‘ঘরের পাশে টিকা দেওয়াতে ভালোই হলো। দূরে কোথাও যাওয়া লাগল না। ছোটবেলায় যেমন টিকা নিছি এখন আবার নিতেছি। প্রথম প্রথম আমাদের ভয় ছিল। তবে এখন তা একদমই নেই। অনেকটা ‘ঈদের আনন্দ’ লাগছে।’

একটি বাসায় কাজ করেন তেইশ বছর বয়সি সুফিয়া খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমার এতদিন ভোটার আইডি কার্ডের সমস্যা আছিল। নম্বরটা ছিল। কার্ড গিরামের বাড়িতে রাইখা আসছি। এখন জন্মনিবন্ধনের কার্ড দিয়া ভালো করেই টিকা নিতে পারছি। অনেক বেশি ভালা লাগছে।’

টিকাদানের কাজে সহযোগিতা করছিলেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকরা। তাদের একজন সাদিয়া আক্তার মিম।

তিনি বলেন, রাজধানীর সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইলে ৩ লাখের বেশি লোকের বাস। এখানে টিকাদান কার্যক্রমে তারা সিরিয়াল পরিচালনা এবং অন স্পট রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৮ বছরের বেশি বয়সি সবাইকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তবে কেন্দ্রগুলোতে পুরুষের তুলনায় নারীদের উপস্থিতি একটু বেশি দেখা যায়।

বস্তির টিকা কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা সময়ের আলোকে বলেন, ২৫টি বুথে মঙ্গলবার ১৫ হাজার টিকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। বুধবার থেকে দেওয়া হবে ২০ হাজার ডোজ। বাকিটা শনিবারও দেওয়া হবে। বস্তিতে বসবাস করা ১৮ বছরের বেশি সবাইকে টিকা দেওয়া হবে। বস্তিবাসীদের দেড় লাখ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের টিকাদান কর্মসূচির পরিচালক ডা. শামসুল হক বলেন, কড়াইল বস্তিতে ৩ লাখের মতো মানুষ আছে। তাদের অনেকেই টিকা নিয়েছে, যারা নেয়নি তাদেরই আমরা টিকা দেব। তবে অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি বয়সিদের টিকা দেওয়া হবে, এর নিচে নয়। পুরো বস্তিকেই আমরা টিকার আওতায় নিয়ে আসব। যে কয়দিনই লাগে, এ কার্যক্রম চলবে।

এর আগে গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বস্তি এলাকায় টিকাদান কর্মসূচির কথা জানান।

তখন তিনি বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ কমার অন্যতম কারণ হলো টিকা প্রদান। আমরা ইতোমধ্যেই প্রথম ডোজের টিকা দিয়েছি ৫ কোটিরও বেশি মানুষকে এবং দ্বিতীয় ডোজ দিয়েছি ৩ কোটির বেশি মানুষকে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৫ লাখ মানুষ টিকা পাচ্ছেন। নভেম্বর মাসে ৩ কোটি টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আর জানুয়ারি মাসের মধ্যে ৭০ ভাগ টিকা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বস্তিদায়ক জায়গায় রয়েছে। আমরা করোনা সংক্রমণ মোকাবিলা করতে পেরেছি। গত এক মাস ধরে দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে আমরা চাই দেশের সংক্রমণ ও মৃত্যু শূন্যের কোটায় চলে আসুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *