বাংলাদেশের বিশ্বস্ত সামরিক অংশীদার হতে চায় তুরস্ক

বাংলাদেশের বিশ্বস্ত সামরিক অংশীদার হতে চায় তুরস্ক

তাজা খবর:

বাংলাদেশের বিশ্বস্ত সামরিক অংশীদার হতে চায় তুরস্ক। একই সাথে মুসলিম বিশ্বের এই প্রভাবশালী দেশটি বাংলাদেশের সাথে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন জোরদার করতে আগ্রহী। বাংলাদেশ কূটনৈতিক সংবাদদাতা সমিতির (ডিকাব) সাথে মতবিনিময়ে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মুস্তোফা ওসমান তুরান এই আগ্রহের কথা জানান।

গতকাল রাজধানীর বারিধারায় তুরস্ক দূতাবাসে এই মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডিকাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহফুজ মিশু। সমাপনী বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মঈনুদ্দীন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, সমরাস্ত্র উৎপাদনের দিক থেকে তুরস্ক প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। অল্প কিছু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। সমরাস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে আমরা রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দিই না। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী আমরা সমরাস্ত্র সরবরাহ করতে পারি। বাংলাদেশের নতুন সেনাপ্রধান ইতোমধ্যে তুরস্ক সফর করেছেন। তুরস্কের নৌবাহিনীর প্রধান কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তিনি বলেন, জাহাজ নির্মাণশিল্প বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত। আমরা যৌথ উদ্যোগে সামরিক ও বেসামরিক জাহাজ নির্মাণ করতে পারি। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় টহল নৌযান যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ করা যেতে পারে।

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনীতি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে অঞ্চলটিতে চীনের আধিপত্যে ভারসাম্য আনতে চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কারো পক্ষাবলম্বন করছে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অবলম্বন করছে। তবে এশিয়ার ক্ষেত্রে তুরস্ক যে নীতি অবলম্বন করে, তাতে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

মুস্তোফা ওসমান তুরান বলেন, ২০১৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা ব্যর্থ হয়। এ সময় তুরস্কের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানকে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠিয়েছিলেন। এটি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোড় ঘোরোনা একটি ঘটনা। কেননা এই সঙ্কটকালে ন্যাটোসহ আমাদের মিত্র অনেক দেশ এই সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মতো শক্তিশালী অবস্থান নেয়নি, প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত মার্চে প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে সে সময় সফরটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ঢাকা সফরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের পক্ষে তুরস্কের অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কে যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে তুরস্কের অবস্থান নেই। একটি ভুলবোঝাবুঝি থেকে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে তুরস্ক মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। আমরা মনে করি এর ফলে অপরাধ কমে না, উল্টো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে জোরদার সম্পর্ক কারো কারো স্বার্থের অনুকূল না-ও হতে পারে।

তুরান বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সময়ে বাংলাদেশকে যে কয়টি দেশ সরাসরি সমর্থন দিয়েছিল, তার মধ্যে তুরস্ক অন্যতম। তুরস্কের ফার্স্ট লেডি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে তাদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের চিকিৎসার জন্য ফিল্ড হাসপাতাল নির্মাণ করেছিল তুরস্ক। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবীদের জন্য অর্থের জোগান দিয়েছে তুরস্ক। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধর পাঁচটি দেশ পুরো পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর বিরোধিতা করেন। চীন ও রাশিয়ার কারণে নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা রোহিঙ্গাদের সমর্থনে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাসহ (ওআইসি) অন্যান্য ফোরামে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ক্রমান্বয়ে বাড়ছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, এই বাণিজ্য ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা আমাদের রয়েছে। চলতি মাসেই তুরস্কের একটি বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসছে। এই প্রতিনিধিদল বেসরকারি খাত সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন বণিক সমিতির সাথে মতবিনিময় করবে। তুরস্কের প্রতিনিধিদলের এই সফরের লক্ষ্য বাংলাদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধশিল্প রয়েছে। তৈরী পোশাক, চামড়াজাত ও পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ়। স্বল্প মজুরির দক্ষ শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে তুরস্ক এ সব খাতে বিনিয়োগ করতে পারে।

সুফিবাদ নিয়ে বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের ঐতিহাসিক সংযোগকে পুনরুজ্জীবিত করতে দূতাবাস ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বাউল সঙ্গীতের আয়োজন করতে যাচ্ছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *