বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার একগুচ্ছ উদ্যোগ

বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার একগুচ্ছ উদ্যোগ

তাজা খবর:

আগামী দিনের জন্য সুন্দর ঢাকা গড়ার একগুচ্ছ পরিকল্পনাসহ ড্যাপ চূড়ান্ত হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এ পরিকল্পনা ৩০ ডিসেম্বর অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এখন গেজেট আকারে প্রকাশ করতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য শিগগিরই পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে চলতি মাস অথবা পরবর্তী মাসে গেজেট হতে পারে। ঢাকায় বসবাস উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যেই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। গেজেটভুক্ত ড্যাপ সবার প্রত্যাশ পূরণ করবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। এরপরও কিছু আপত্তি থাকছেই।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, এবারের মহাপরিকল্পনায় রয়েছে নতুন কিছু চমক। সুন্দর ঢাকা গড়ার পরিকল্পনায় আছে, ঢাকার নগরায়ণ, কেন্দ্রীয় অঞ্চল থেকে চারপাশে ছড়িয়ে দেওয়া। সে লক্ষ্যে রাজউকের ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে জনঘনত্বের বিবেচনায় কেন্দ্রীয়, বহিস্থ ও অন্যান্য-এ তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এখানে কেন্দ্রীয় বলতে ঢাকার মূল এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। এ এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক জনঘনত্বের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা থাকবে। আর বহিস্থ এলাকা বলতে রাজধানী শহরের খুব কাছের এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। যেসব এলাকা দ্রুততম সময়ে নগরায়ণ ঘটবে। এসব এলাকা সিটি করপোরেশনভুক্ত হলে ওয়ার্ড ভিত্তিক জনঘনত্ব নির্দেশনা থাকবে। আর ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা হলে ইউনিয়ন ভিত্তিক জনঘনত্ব এবং ভবনের উচ্চতার ব্যাপারে নির্দেশনা থাকবে। ড্যাপে অন্যান্য এলাকা বলতে কেন্দ্রীয় ও বহিস্থ এলাকার বাইরের এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। এসব এলাকা মূলত রাজউকভুক্ত উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা। এসব ক্ষেত্রে ইউনিয়ন ভিত্তিক ভবনের উচ্চতা ও জনঘনত্বের ব্যাপারে নির্দেশনা থাকবে।

এছাড়া ব্লক বেইজ ডেভেলপমেন্ট অর্থাৎ খণ্ড খণ্ড ভবন নির্মাণ না করে হাউজিং সোসাইটি গড়ে তোলার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভবনের উচ্চতা বেশি দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের উন্নয়নে উন্মুক্ত স্থান, কমিউনিটি স্পেসসহ পরিবেশবান্ধব আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার প্রবণতা বাড়বে। মেট্রো স্টেশন ভিত্তিক উন্নয়নের বিষয়ে বিশেষ সুপারিশ রাখা হয়েছে। এটা হলে বাণিজ্যিক প্রসারের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রা সহজতর হবে। মেট্রো স্টেশনের পাশে অতি উচ্চ ভবনের অনুমোদন দেওয়া হবে। যেখান থেকে মানুষ মেট্রো ট্রেন ব্যবহার করে চলাচল করতে পারবে। পাশাপাশি পৃথিবীর উন্নত দেশের অনুকরণে রি-ডেভেলপমেন্টের সুপারিশ রাখা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজও করছে রাজউক। এর মাধ্যমে রাজউক পুরান ঢাকাকে নতুন করে গড়ে তুলতে চায়।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, এবারের ড্যাপে পুরো রাজউক এলাকাকে ৬টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, কেন্দ্রীয় অঞ্চল (মূল ঢাকা), পূর্ব অঞ্চল (রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ), উত্তর অঞ্চল (গাজীপুর), দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল (কেরাণীগঞ্জ), দক্ষিণ অঞ্চল (নারায়ণগঞ্জ) এবং পশ্চিম অঞ্চল (সাভার)। এ বিভাজনের আলোকে ভূমি ব্যবহার ও উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, ৩০ ডিসেম্বর রাজউকের মহাপরিকল্পনা স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন করেছে। তবে ওই বৈঠকে কিছু বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে। সংশোধনসহ মহাপরিকল্পনার কপি মন্ত্রণালয়ে পাঠালে আমরা কমিটির সভাপতির কাছে পাঠাব। কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে পাঠাবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাক্রমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজউকের প্রথম ড্যাপ নিয়ে অভিযোগ আছে। বলা হয় সেটা টেবিল মেকিং ছিল। সংশোধিত ড্যাপের ব্যাপারে এমন অভিযোগ দেওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মত নেওয়া হয়েছে। সেটাকে সামগ্রিক পরিকল্পনার মানদণ্ডে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে আগামীতে ঢাকার বাসযোগ্যতার বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ড্যাপ রিভিউসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সংশোধিত ড্যাপের মৌলিক সব বিষয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে ৩০ ডিসেম্বর চূড়ান্ত করেছে। ওই সভা থেকে কিছু বিষয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেটা চূড়ান্ত করে এ পরিকল্পনা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করে সে কাজগুলো করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে শিগগিরই সংশোধিত ড্যাপ চূড়ান্ত হবে। এ ড্যাপের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা অনেকাংশে বাসযোগ্যতা ফিরে পাবে।

জানতে চাইলে নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রিসভা কমিটিতে চূড়ান্তকরা ড্যাপেও অনেক ত্রুটি রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম, জলাধারকে বিভিন্ন শ্রেণিতে নামকরণ, অঞ্চলভিত্তিক জনঘনত্ব ত্রুটিপূর্ণ, ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) অসমতা, ধনী-দরিদ্রে বৈষম্য এবং স্ববিরোধী অনেক বিষয় রয়েছে। এ বিষয়গুলো সংশোধন ছাড়া ড্যাপ চূড়ান্ত হলে সেটা ভালো কিছু হবে না।

তিনি বলেন, ড্যাপে ফুটপাতের প্রশস্ততা ২৫ ফুট দেখানো হয়েছে। সেখানে হকার বসানোর সুপারিশসহ নানা প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকার কোনো ফুটপাত ২৫ ফুট। এমন অবাস্তব বিষয়গুলো সংশোধন না হলে ঢাকা কিভাবে বাসযোগ্য হবে।

তিনি বলেন, মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি আমাদের প্রস্তাবগুলো মেনে ড্যাপের খসড়া সংশোধন করে গেজেট আকারে প্রকাশ করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। সেটা হলেতো ভালো। কোনো কারণে সেটা না হলে আমরা ড্যাপের সার্বিক ত্রুটি-বিচ্যুতি জাতির সামনে তুলে ধরব।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, রাজউকের নতুন মহাপরিকল্পনায় ইতিবাচক অনেক বিষয় রয়েছে। যেগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বাসযোগ্যতা অনেকাংশে উন্নতি ঘটবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঢাকাকে কেন্দ্রীভূত এলাকে থেকে ছড়িয়ে দেওয়া। ব্লক বেইজ ডেভেলপমেন্ট, মেট্রো স্টেশনভিত্তিক উন্নয়ন ও রি-ডেভেলপমেন্ট। পাশাপাশি মিশ্র এলাকা, জলাধার ও কৃষি অঞ্চলের বিষয়ে প্রস্তাবনাগুলো সংশোধন করতে পরিকল্পনাবিদদের পক্ষ থেকে সংশোধনের জন্য বলা হয়েছে। এগুলো সংশোধন হওয়া জরুরি। এগুলো হয়েছে কিনা, সেগুলো এখনো জানি না। হলে আমরা খুশি হব। না হলে আমাদের আপত্তি থাকবে।

ড্যাপ রিভিউসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (এলজিআরডি) মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) আগে খসড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনের পর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। কোনো পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ড্যাপ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা কারও প্রতি যদি অবিচার করা হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ড্যাপ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে রিভিউ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভার আয়োজন করা হয় ৩০ ডিসেম্বর। উপস্থিত সবার সিদ্ধান্তক্রমে ড্যাপ চূড়ান্ত হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রেরণ করা হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব এবং এফএআর নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো এলাকাভিত্তিক ভবনের নির্দিষ্ট উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়নি। রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব এবং এফএআরের মান পুনর্নির্ধারণ করা হবে। ছয় তলার বেশি করা যাবে একথা সঠিক নয়। ভবনের উচ্চতা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, সব পক্ষের সঙ্গে একাধিকবার বসে আলোচনা করে তাদের পরামর্শ এবং আপত্তি সবগুলোই আমলে নিয়ে খসড়া ড্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের আরও যদি কোনো চাহিদা থাকে এবং যেখানে দ্বিমত থাকে সেগুলো সমাধান করা হবে। সব প্রকার নাগরিক সুবিধা রেখে ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। এরপরও যদি সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাও করা হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকার জন্য প্রথম মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় ২০১০ সালে। ৫ বছর মেয়াদি এ মহাপরিকল্পনা শেষের আগে সংশোধিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে রাজউক। এর মেয়াদকাল ঘোষণা করে ২০১৬-২০৩৫। বহু কাঙ্ক্ষিত এ পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলেই গেজেট আকার প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *