বিস্তর অভিযোগ, তবু তদন্ত কমিটির বিরোধিতায় উপাচার্য

বিস্তর অভিযোগ, তবু তদন্ত কমিটির বিরোধিতায় উপাচার্য

তাজা খবর:

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মসহ ১৭ ধরনের অভিযোগ তাঁর নামে। এ বিষয়ে তদন্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গত ১৯ সেপ্টেম্বর গণশুনানি আয়োজন করলেও তাতে হাজির হননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, এটা তাঁর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অসম্মান।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা পরিবর্তন করেছেন তিনি। কমিয়েছেন শিক্ষাগত যোগ্যতা। এই পরিবর্তনের সুযোগে শিক্ষক হয়েছেন উপাচার্যের কন্যা ও জামাতা। অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে বাদ দিয়ে নিয়োগ পাওয়া এক শিক্ষক পরে হন সহ–উপাচার্যের জামাতা। পরিবর্তিত নীতিমালায় শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন অন্তত ৩৪ জন।
আব্দুস সোবহানসহ তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়মের তদন্ত করছে ইউজিসি। যার কাজ প্রায় শেষ করেছে ইউজিসি। শিগগির তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে তদন্তের জন্য গণশুনানির আয়োজন করে কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়ম ভেঙে বিভিন্ন বিভাগে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া, উপাচার্যের নির্দিষ্ট বাসায় ওঠার পরও আগের বাসা দীর্ঘদিন ধরে আঁকড়ে রেখে ভাড়া বাবদ আর্থিক ক্ষতিসাধন, স্বজনপ্রীতিসহ আরও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চলছে। এসব অভিযোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই একটি অংশ।

ইউজিসি সূত্র প্রথম আলোকে বলেছে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ এসেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে। দুই সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে আছেন ইউজিসির সদস্য দিল আফরোজা বেগম।

এতসংখ্যক অভিযোগ ওঠা এবং গণশুনানিতে না আসার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে উপাচার্য আবদুস সোবহান প্রথম আলোকে বলেছেন, এ বিষয়ে যা বলার গত ৯ সেপ্টেম্বর ইউজিসিকে চিঠি দিয়েই বলেছেন। সেখানেই তাঁর সব কথা বলা আছে। এর বাইরে তিনি আর কিছু বলতে চান না।

সূত্র জানিয়েছে, ইউজিসি চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতে উপাচার্য তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

অবশ্য তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও ইউজিসির সদস্য দিল আফরোজা বেগম কিছুদিন আগে প্রথম আলোকে বলেন, যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটি আইনসিদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইউজিসির চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি হয়ে তাঁরা এই তদন্ত করছেন। ইউজিসির আইনে এই সুযোগ রয়েছে।
আবদুস সোবহান এখন দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম মেয়াদেও (২০০৯-২০১৩) তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল এবং এরপর তখন তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তখন উপাচার্য নিয়োগ পান মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। মিজানউদ্দিনের মেয়াদ শেষে ২০১৭ সালে ৭ মে দ্বিতীয়বারের মতো উপাচার্য হন আবদুস সোবহান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য আবদুস সোবহান সবচেয়ে বিতর্কিত হন ‘সর্বজন প্রশংসিত’ শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে। এতে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা কমানো হয়। আগের নীতিমালায় আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল সনাতন পদ্ধতিতে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত চারটি স্তরেই প্রথম শ্রেণি বা গ্রেড পদ্ধতিতে এসএসসি ও এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ ৪.৫০, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫০ এবং স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মেধাক্রম প্রথম থেকে সপ্তমের মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু সেই যোগ্যতা কমিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ মোটাদাগে ৩.২৫–এ নামিয়ে আনা হয় এবং মেধাক্রমে থাকার শর্তও তুলে দেওয়া হয়।

নিয়োগের যোগ্যতা শিথিলের পর উপাচার্যকন্যা সানজানা সোবহান ও জামাতা এ টি এম শাহেদ পারভেজ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এর মধ্যে মার্কেটিং বিভাগ থেকে পাস করা সানজানা নিয়োগ পান ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে। আর শাহেদ নিয়োগ পান ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ)। অথচ আগের নীতিমালা থাকলে তাঁরা শিক্ষক হওয়ার আবেদনই করতে পারতেন না। কারণ, বিভাগে তাঁদের মেধাক্রম সাতের মধ্যে ছিল না। এর মধ্যে কন্যার ছিল ২১তম এবং জামাতার এমবিএ পরীক্ষায় মেধাক্রম ছিল ৬৭তম। আবার এমবিএতে তাঁর ফল ছিল সিজিপিএ ৩.৪৭। অথচ মার্কেটিং বিষয়ে আইবিএতে আবেদনকারী ১৮ জনের মধ্যে ১৬ জনেরই স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ছিল ৩.৫০–এর ওপরে।
অনিয়মের অভিযোগ ওঠে আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগেও। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে তিনটি স্থায়ী (সহকারী অধ্যাপক/প্রভাষক) পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে ৪১ জন প্রার্থী আবেদন করেন। কিন্তু অনুষদে প্রথম হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক পাওয়া, এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রথম বিভাগ বা শ্রেণি থাকা আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে নিয়োগ পাওয়া মো. সালাউদ্দিন সাইমুম পরে সহ–উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়ার মেয়েকে বিয়ে করেন। অভিযোগ ওঠে ‘যোগসাজশ’ করেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়। আরেকজনও বিভাগের এক শিক্ষকের স্ত্রী। বর্তমান উপাচার্যের আগের মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া বিভাগের ওই শিক্ষকের নিয়োগের সময়ও প্রশ্ন উঠেছিল। কারণ, আবেদনের সময় তাঁর এলএলএম–ই শেষ হয়নি। এমনকি তাঁর স্নাতকে (সম্মান) প্রথম শ্রেণিও ছিল না। এ বিষয়ে এক চাকরিপ্রার্থী মামলাও করেছিলেন।

আইন বিভাগের এই শিক্ষক নিয়োগের সময় সহ–উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়া একজন প্রার্থীর স্ত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেন নিয়ে কথা বলেন, যার অডিও ফাঁস হয়।

নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তনের পর ২০১৮ সালে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগে চারজন শিক্ষক নিয়োগ হয়। যাঁদের মধ্যে তিনজনের আগের নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন করার যোগ্যতাই ছিল না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগসহ আরও কয়েকটি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

ইউজিসি তদন্ত কমিটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তাঁদেরও মনে হয়েছে এভাবে শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানো ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের পরিপন্থী। ভবিষ্যতে যাতে আর কেউ এমনটা করতে না পারেন, সেটাই তাঁরা চান।
আরও যত অভিযোগ উপাচার্য আবদুস সোবহান ২০১৭ সালের মে মাসে দায়িত্ব নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনে ওঠেন। এ জন্য ২০১৩ সাল থেকে অধ্যাপক হিসেবে তাঁর নামে বরাদ্দ করা ডুপ্লেক্স বাড়িটি কাগজপত্রে ছেড়ে দিলেও আসবাব রাখার জন্য প্রায় দেড় বছর দখলে রাখেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ি ভাড়ার আয় থেকে বঞ্চিত হয়।
এ ছাড়া অস্থায়ী ও দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসহ আরও বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডসহ বিভিন্ন রাস্তায় ‘অপরিকল্পিত’ উন্নয়ন, ঘাস লাগানো, আবার সেই ঘাস উঠিয়ে ফুটপাত তৈরি করে অর্থের অপচয়, যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত একাধিক শিক্ষককে আইনের ফাঁকফোকরে শাস্তি থেকে অব্যাহতি, ইংরেজি বিভাগে স্নাতকোত্তরের ফল পরিবর্তনের চেষ্টা ইত্যাদি। শিক্ষকদের দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, আবদুস সোবহান প্রথম মেয়াদে ৩৪৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেন, যাঁদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই নিয়োগ–বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং অভিযোগ তদন্তে ইউজিসির এখতিয়ার নিয়ে উপাচার্যের প্রশ্নের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে তদন্ত ইউজিসিই করে আসছে। আগে তো কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। অভিযোগ উঠলে তদন্ত হতেই পারে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *