ভাসানচরে জাতিসংঘ কার্যক্রম শুরু

ভাসানচরে জাতিসংঘ কার্যক্রম শুরু

তাজা খবর:

ইতোপূর্বে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সোমবার থেকে ভাসানচরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যক্রম শুরু করেছে জাতিসংঘ। বিশ্ব অভিভাবক এই সংস্থাকে এ কাজে যুক্ত করার বিষয়টি বাংলাদেশের ক‚টনৈতিক সাফল্য হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ৯ অক্টোবর ঢাকায় এই সংক্রান্ত জাতিসংঘের পক্ষে ইউএনএইচসিআর-এর সঙ্গে সরকারের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা অনুযায়ী চুক্তির পর তিনমাসের মধ্যে জাতিসংঘের তত্ত¡াবধায়নে ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হবে এবং সেখানে বর্তমানে স্থানান্তরিত প্রায় ১৯ হাজারসহ মোট ১ লাখ ৩ হাজার রোহিঙ্গার দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের পক্ষে এ কাজে ইউএনএইচসিআর এবং ডবিøউএফপি কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। ইউএনএইচসিআর উখিয়া টেকনাফের ৩৪ আশ্রয় ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সাহায্য সহযোগিতা ইত্যাদি নিয়ে শুরু থেকেই কাজ করে আসছে। এখন তারা চুক্তি অনুযায়ী ভাসানচরেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ শুরু করল।

সোমবার সকালে জাতিসংঘের ২১ সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামে পতেঙ্গার বোট ক্লাব জেটি থেকে নৌবাহিনীর জাহাজযোগে রওনা হয়ে দুপুরের আগেই ভাসানচরে পৌঁছে। দলটির সঙ্গে নেয়া হয়েছে দুটি জীপ গাড়ি, দুটি মাইক্রো বাস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি। প্রসঙ্গত ভাসানচরে ইতোমধ্যে একুশ কিলোমিটার পাকা রাস্তা নির্মিত হয়েছে। ২১ সদস্যের এই প্রতিনিধি দলের জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর (ডবিøউএফপি) কর্মকর্তারা রয়েছেন।

জাতিসংঘের এ দলটি পৌঁছার পর প্রকল্পের উপ-পরিচালক কমান্ডার আনোয়ারুল কবিরের নেতৃত্বে নৌবাহিনীর সদস্যরা তাদের স্বাগত জানায়। দলটি চার ভাগে বিভক্ত হয়ে সেখানে তাদের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে দলটি সেখানে চারদিন অপেক্ষা করবে এবং ঢাকায় ফিরে এসে তাদের পরবর্তী কার্যক্রম ঘোষণা করবে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে সাড়ে ১২ লাখেরও বেশি। এদের অধিকাংশ বর্তমানে উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি শিবিরে বসবাস করে আসছে গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে। জনসংখ্যার আধিক্যে উখিয়া-টেকনাফে ইতোমধ্যে বিপর্যয় নেমে এসেছে। আশ্রিত রোহিঙ্গারা বন ও ভ‚মি উজাড় করেছে।

যেটা এলাকার স্থানীয় মানুষের জন্য দুর্ভোগের মারাত্মক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া নিজেদের মধ্যে হানাহানি সংঘর্ষ, চুরি ডাকাতি নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভয়ানক বিষয় হয়েছে এরা মিয়ানমার থেকে মরণ নেশা মাদক ইয়াবা চোরাচালান করে আনছে এর পাশাপাশি টেকনাফ পয়েন্ট থেকে বিদেশে মানবপাচারের সঙ্গেও জড়িত হয়ে পড়েছে। সবকিছু বিবেচনায় এনে সরকার নোয়াখালীর হাতিয়ায় বঙ্গোপসাগর বক্ষে জেগে ওঠা চরটিকে বসবাসযোগ্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নৌবাহিনীর মাধ্যমে সেখানে ১ লাখেরও বেশি মানুষ বসবাসের উপযোগী করে ক্লাস্টার হাউস নির্মাণ করেছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে ইতোমধ্যে ১৮ হাজার ৮৪৬ রোহিঙ্গাকে নৌবাহিনীর তত্ত¡াবধানে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এখন টার্গেট রয়েছে আরও ৮০ হাজারকে স্থানান্তর করা।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিষয়টি শুরুতে জাতিসংঘসহ দাতাসংস্থাগুলো সায় দেয়নি। তারা বিভিন্নভাবে এই দ্বীপে ঘূর্ণিঝড়সহ ঝড়-জলোচ্ছ¡াসের বিষয়টি তুলে ধরে এবং এই ধরনের ঘটনা ঘটলে সেখানে মানুষ বাঁচানো কঠিন হবে বলে মত ব্যক্ত করে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে ভাসানচরে বসবাসের জন্য কি তৈরি করা হয়েছে মানুষের জন্য অন্যান্য কি কি অনুষঙ্গ রাখা হয়েছে সবকিছু বিস্তারিত তুলে ধরার পর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার প্রতিনিধিদল এই চর সফর করে। এরপর তারা বিষয়টি বিবেচনায় আনে এবং নিশ্চিত হয় যে এতে সর্বোচ্চ উচ্চতার জলোচ্ছ¡াস হলেও সেখানকার স্থাপনা এবং মানুষ প্রাণ নিয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। এইসব বিষয় নিয়ে ক‚টনৈতিক তৎপরতা চলে। অবশেষে গত ৯ অক্টোবর জাতিসংঘের ইঙ্গিতে ইউএনএইচসিআর-এর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ঢাকায়। সে অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ আশ্রয় শিবির থেকে ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে জাতিসংঘের তত্ত¡াবধানে স্থানান্তর করা হবে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে যারা উদ্বিগ্ন ছিল তাদের উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে।

৯ অক্টোবর সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের সমঝোতা স্মারকটিতে স্বাক্ষর করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মহসিন এবং বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইউহানেস ফন ডার ক্লাউ।

এদিকে সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভাসানচরে এ পর্যন্ত ৬ দফায় ১৮ হাজার ৮৪৬ রোহিঙ্গ জনগোষ্ঠীর সদস্যকে নৌবাহিনীর মাধ্যমে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এ কাজের সহযোগিতা দিয়েছে বিভিন্ন দেশীয় এনজিও সংস্থা। সরকার ইউএনএইচসিআরের যৌথ উদ্যোগে এখন থেকে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও পুষ্টি, সুপেয় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, চিকিৎসা, মিয়ানমার কারিক্যুলাম ও ভাষায় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও জীবিকায়নের ব্যবস্থা করা হবে। সরকার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কর্মরত জাতিসংঘ এবং এর সহযোগী সংস্থাসমূহ ও দেশীয়-আন্তর্জাতিক এনজিও কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করবে। এর পাশাপাশি ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের কারণে সন্নিহিত এলাকা ও জনগণের ওপর যদি কোন ধরনের বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে তা নিরসনে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল এ্যান্ড প্রটেকশন সাব কমিটির সুপারিশ মোতাবেক আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্পের আওতায় ভাসানচরে ১৪৪০ আশ্রয়গৃহ ও ১২০ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে নৌবাহিনীর সক্রিয় তত্ত¡াবধানে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮ হাজার ৮৪৬ রোহিঙ্গাকে উখিয়া টেকনাফ থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়। এরপর কোভিডজনিত কারণে তা বন্ধ থাকে। এরইমধ্যে জাতিসংঘসহ বিদেশী দাতাসংস্থাগুলোর ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পাওয়ার পর গত ৯ অক্টোবর সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

ভাসানচরে সরকারের ২৩১২ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ১২০টি ক্লাস্টার বা গুচ্চ গ্রামের সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসবাসের স্থান। প্রতিটি ক্লাস্টারে রয়েছে ১২টি করে হাউস। পাকা দেয়ালের ওপর টিনশেডের প্রতি হাউসে রয়েছে ১৬টি কক্ষ। চারজন করে একটি পরিবারের সদস্যদের প্রতি কক্ষে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো ভাসানচরটি ১৩ হাজার একর আয়তনের। এই চরের ১৭০২ একর জমির চারদিকে ১০০ বছরের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসের পরিসংখ্যান নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে উঁচু বাঁধ। প্রকল্পের জন্য এ পর্যন্ত জমি ব্যবহার করা হয়েছে ৪৩২ একর। প্রকল্প সম্প্রসারণে এবং বনায়ন কাজে রাখা হয়েছে ৯১৮ একর জমি। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা নৌবাহিনী আগেই জানিয়েছে প্রতিটি ক্লাস্টারের জন্য চার তলা বিশিষ্ট একেকটি আশ্রয় কেন্দ্র যা ২৬০ কিলোমিটার গতিবেগের ঘূর্ণিঝড়েও টিকে থাকতে সক্ষম।

এখানে আরও উল্লেখ্য ভাসানচরে দেশী-বিদেশী ভিআইপি ও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তাদের থাকার জন্য একটি শপিংমল তিনটি ফাইভ স্টার হোটেল সুপারশপ এবং রেস্তরাঁ নির্মাণ কাজ চলছে। ইতোমধ্যে লন্ড্রি, সেলুন এবং কাঁচাবাজার চালু হয়েছে। গৃহস্থালী কাজের সঙ্গে পশুপালনও শুরু হয়েছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম এবং খেলাধুলার জন্য মাঠও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভাসানচরকে ইতোমধ্যে থানায় পরিণত করা হয়েছে। পুলিশ দলের পাশাপাশি এপিবিএন ও নৌবাহিনীর সদস্যরাও সেখানে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *