ভাসানচর অনেক বেশি নিরাপদ, বলছে ঢাবির গবেষণা

ভাসানচর অনেক বেশি নিরাপদ, বলছে ঢাবির গবেষণা

তাজা খবর:

নোয়াখালীর ভাসানচর দ্বীপটি পুরোপুরি বাসযোগ্য বলে এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের একদল গবেষক বলছেন, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ভাসানচর ডুবে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ভাসানচর অনেক বেশি নিরাপদ।

আজ শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর: সুবিধা ও প্রতিকূলতা’ শীর্ষক ওই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।

২০২০ সালের ১৮-১৯ নভেম্বর ভাসানচরে ৯ জনের ও একই বছরের ১০-১২ ডিসেম্বর কক্সবাজারে ৩০ জনের সাক্ষাৎকার এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এই গবেষণায় সহায়তা করেছে সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (সিএফআইএসএস)।

অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রধান গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম৷ তিনি বলেন, এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল ভাসানচরের সামাজিক ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করা। গবেষণার তথ্য-উপাত্ত, ভূতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতামত বিশ্লেষণ করে তাঁদের গবেষণা বলছে, ভাসানচর একটি নতুন দ্বীপ হিসেবে পুরোপুরি বাসযোগ্য। এই দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলো আধুনিক বাসস্থান, রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র ও বাঁধ (উচ্চতা ৯ থেকে ১৫ ফুট করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন) দ্বীপটিকে টেকসই করেছে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটি ডুবে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বিশেষত তিন স্তরের দুর্যোগ নিরাপত্তাব্যবস্থা দ্বীপটিকে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কবল থেকে রক্ষা করবে। এ ছাড়া প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, কৃষিকাজ, সবজি চাষ, মাছ শিকারসহ আরও জীবন-জীবিকার সুযোগ এখানে রয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মকর্ম পালন ও বিনোদনের জন্য আছে বিশেষ সুবিধা৷ বিশেষ পরিস্থিতিতে দুর্যোগ হলে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র।

ভাসানচরকে আরও টেকসই করে তোলার লক্ষ্যে গবেষণা প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদ ও দুর্যোগ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা সুপেয় পানির যথাযথ ব্যবহারের প্রতি নজর দেওয়ার কথা বলেছেন। যেহেতু দ্বীপগুলোয় পানির সংকট দেখা দেয়, তাই ভবিষ্যতে পানি-সংকট এড়ানোর জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও দৈনন্দিন কাজে এ পানি বেশি করে ব্যবহারের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে৷ রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েদের তাদের নিজ ভাষায় পাঠদান ও রোহিঙ্গাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ পালন করার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে৷ সুপারিশে কিছু ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প স্থাপনের কথাও তুলে ধরা হয়, যাতে দরিদ্র রোহিঙ্গারা নিজেদের আয়ের ক্ষেত্রে আরও বৈচিত্র্য আনতে পারে৷ জায়গাটির সম্ভাবনাগুলোর আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্য অধিকতর বিষয়ভিত্তিক গবেষণার সুযোগ রয়েছে৷

গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. তৌহিদুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মাদ শাহীনুর আলম ও মারিয়া হোসাইন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল৷ তিনি বলেন, জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে কক্সবাজারের অবস্থা ভাসানচরের চেয়ে অনেক পেছনে৷ আর্থসামাজিক অবস্থা, মানবিকতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা—সব বিবেচনায় সুবিন্যস্ত উপায়ে সরকার ভাসানচরে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা কক্সবাজারের অবিন্যস্ত আশ্রয়ের চেয়ে অনেক ভালো৷ ভূতাত্ত্বিকভাবে দ্বীপটি স্থিতিশীল, সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সেই ক্ষতি বা তীব্রতা কমিয়ে আনা সম্ভব৷ সব ধরনের নিরাপত্তাসহ রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা হচ্ছে৷ সেই বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচর তাদের দেশের থেকেও, যেখানে তারা ক্রমাগতভাবে নির্যাতিত হয়েছে, একটি অভয়ের জায়গা, একটি নির্ভরযোগ্য জায়গা৷ এর ফলে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে সমালোচনার কোনো সুযোগ নেই৷ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনে এগিয়ে আসা উচিত৷

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিএফআইএসএসের চেয়ারম্যান কমোডর (অব.) এম এন আবসার৷ সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন ও ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান এতে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তাঁরা গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *