ভিয়েতনাম থেকেও ফিরছে অর্ডার

ভিয়েতনাম থেকেও ফিরছে অর্ডার

তাজা খবর:

বাংলাদেশ থেকে গত সেপ্টেম্বর মাসে ৩৪১ কোটি ৮৮ লাখ ডলার মূল্যের (২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার) তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। একক মাস হিসেবে এ যাবৎকালের এটাই সর্বোচ্চ রপ্তানি। যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, কভিড পরিস্থিতির স্থবিরতা কাটিয়ে উঠছে পোশাকের বাজার। ভারতের পর তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম। সেখানেও করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের কারণে পোশাক কারখানা বন্ধ থাকা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে বিশ্বে যখন করোনাভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছিল তখন এই অতিমারি ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল ভিয়েতনাম। এমনকি করোনাভাইরাস আবির্ভাবের পর থেকে গত জুন পর্যন্ত দেড় বছরে দেশটিতে মাত্র ১৬ হাজার ৮৬৩ জন সংক্রমিত হয়, কিন্তু গত তিন মাসে দেশটিতে করোনা শনাক্ত হয়েছে আট লাখের বেশি। এই তিন মাসে কভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৯ হাজার ৮৯৮ জন। এমন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে বিশ্বখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ডগুলো ভিয়েতনামে অর্ডার দেওয়া পণ্যের যথাসময়ে ডেলিভারি নিয়ে শঙ্কায় পড়ে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে ভিয়েতনামের টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস অ্যাসোসিয়েশন (ভিটাস) আগস্টে বলেছিল, কভিড-১৯-এর ফলে ভিয়েতনামে বিধি-নিষেধের কারণে পোশাক খাতে সরবরাহের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত চেইন ভেঙে গেছে। ক্রীড়া পোশাক ব্র্যান্ড নাইকি গত সপ্তাহে জানিয়েছিল যে ক্রীড়া পোশাক ঘাটতিতে পড়েছে তারা। বিধি-নিষেধ কর্মসূচির কারণে দেশটির দক্ষিণাংশের ৮০ শতাংশ কারখানা এবং দেশের প্রায় অর্ধেক পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে। নাইকি তাদের জুতা সরবরাহের জন্য বহুলাংশে ভিয়েতনামের ওপর নির্ভরশীল। নাইকি ও অ্যাডিডাস বলেছে যে তারা সাময়িকভাবে অন্যত্র থেকে উৎপাদন করার কথা ভেবেছে।

জাপানের জনপ্রিয় ইউনিক্লো ব্র্যান্ড সোয়েটার, সোয়েটপ্যান্ট, হুডি ও ড্রেস নেয় ভিয়েতনাম থেকে। তারা এখন সরবরাহ ঘাটতির জন্য ভিয়েতনামের পরিস্থিতিকে দায়ী করছে। এমনকি বিধি-নিষেধ শিথিল হলেও অনেকে ভিয়েতনামের উৎপাদনে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এএফপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী শীর্ষস্থানীয় ব্যাবসায়িক সংগঠনগুলো ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া এক চিঠিতে ভিয়েতনাম থেকে উৎপাদন সরে যাওয়ার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে এরই মধ্যে তাদের সদস্য দেশগুলোর ২০ শতাংশ অন্য জায়গায় সরে গেছে। তারা বলছে, ‘একবার উৎপাদন সরে গেলে, এটি ফিরে আসা কঠিন।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভিয়েতনাম থেকে সরে যাওয়া অর্ডারের একটা অংশ বাংলাদেশে এসেছে। এর আগে গত মার্চ মাসে ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে একইভাবে সেখান থেকে অনেক অর্ডার বাংলাদেশমুখী হয়েছিল। এমনিতেই রানা প্লাজা দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের চাপে তৈরি পোশাক কারখানায় কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে যে সংস্কারকাজ চলেছে তাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কর্মপরিবেশ সনদ পাওয়া কারখানা এখন বাংলাদেশে। এই সক্ষমতার কারণে তৈরি পোশাক খাতে বিকল্প অর্ডারের কথা ভাবলে স্বাভাবিকভাবে প্রথমেই আসে বাংলাদেশের নাম।

এ ব্যাপারে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও ইস্টার্ণ অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কভিড পরিস্থিতির কারণে যথাসময়ে পণ্য ডেলিভারি পাবে না—এই আশঙ্কায় ভিয়েতনাম থেকে কিছু অর্ডার সরে গেছে। আর পরবর্তী চয়েস হিসেবে ক্রেতাদের জন্য বাংলাদেশ ভালো জায়গা। কারণ বাংলাদেশ এই সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।’ তবে অর্ডার বেশি আসছে এই সুযোগে যাতে নিজেদের সক্ষমতার বেশি অর্ডার নেওয়া না হয় সেদিকে পোশাক মালিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত অর্ডার নেওয়া আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ যদি সক্ষমতা না বুঝে অর্ডার নেওয়া হয় এবং সঠিক সময়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হয় তখন হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।’

শিপিং লাইনগুলোর হিসাবে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত সেপ্টেম্বর মাসে ৬৮ হাজার ৮৯১ একক কনটেইনার পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়েছে, যা আগের মাসের (৬৩৩৯২ একক কনটেইনার) চেয়ে প্রায় ৮.৬৭ শতাংশ বেশি এবং গত বছরের সেপ্টেম্বরের (৫৭৫৬১ একক কনটেইনার) চেয়ে ১৯.৬৮ শতাংশ বেশি।

তবে ভিয়েতনাম থেকে খুব বেশি অর্ডার বাংলাদেশে এসেছে বলে মনে করেন না চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহসভাপতি ও প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি বলেন, ‘রপ্তানি বাড়ার পেছনে ভিয়েতনাম থেকে কিছু অর্ডার বাংলাদেশে শিফট হওয়ার একটা কারণ হতে পারে। তবে তা কোনোভাবেই মূল কারণ না। বরং বাংলাদেশে বর্তমানে যে বায়াররা কাজ করেন তাঁদের বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় এই বায়ারদের কাছ থেকেই অতিরিক্ত অর্ডার আসছে। কাজের দক্ষতা দিয়ে নিজেদের বায়ারদের কাছ থেকে বাড়তি অর্ডার আদায় করে নিচ্ছে এটাই বরং আমাদের জন্য ইতিবাচক।’

ভিয়েতনাম থেকে সরে আসা অর্ডার চাইলেও খুব বেশি ধরার সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনামে মূলত মানুষ তৈরি তন্তু (ম্যান মেইড ফাইবার) দিয়ে কাজ করে। সেখানে আমরা করি তুলার তন্তু দিয়ে। এক মাসের রপ্তানি দিয়ে আসলে বিচার করার সময় আসেনি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *