মাদকবিরোধী অদম্য তরুণ সন্দ্বীপের মুন্না। তাজা খবর

মাদকবিরোধী অদম্য তরুণ সন্দ্বীপের মুন্না। তাজা খবর

তাজা খবর:

চট্টগ্রামের একমাত্র দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের সন্তান শামসুল আজম মুন্না। পেশায় ওয়েবসাইট ডেভেলপার। মা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাবা বেঁচে নেই। ছোট দুই ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। একজন চবি অন্যজন ঢাবি। মা’কে দেখার জন্য বাড়িতে নিয়মিত যাওয়ার কারণে গ্রামের অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ে তার। গ্রামের যুবকরা মাদকে আসক্ত। অনেক শিশু স্কুলে না গিয়ে মাদক পরিবহনে জড়িত। তার নিজ বাড়িতেই মাদক বিক্রি হতো প্রকাশ্যে। রাতদিন সবসময়ই মাদকের খদ্দেরদের যাতায়াত। পরিবেশ ভয়াবহ। শিশুদের জন্য চিন্তিত হন তিনি। চুরি ডাকাতি ছিনতাইসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে কিশোররা। অপরাধীরা সবাই মাদকসেবী। মাদকের টাকা যোগাড় করতেই এসব অপরাধ করছে ওরা।

বিবেকের তাড়নায় এসব দেখেও না দেখার ভান করতে পারে নি শামসুল আজম মুন্না। গঠন করেন ‘হামিদিয়া স্পোর্টিং ক্লাব’ নামে একটি সংগঠন। খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে গ্রামের আগামী প্রজন্মকে রক্ষার চেষ্টা শুরু করেন। সমমনা কয়েকজনের সহযোগিতায় ফুটবল, জার্সিসহ খেলাধুলার বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করেন।

স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত কিশোরদের করেন স্কুলমুখী।

তরুণরা অনেকেই মাদকসেবন ত্যাগ করে সুস্থ জীবন যাপন করতে লাগলো। গ্রামের যুবকদের দিচ্ছেন বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ।

ফলে ধীরে ধীরে মাদকের ক্রেতা কমতে থাকলো। যা মাদক ব্যবসায়ীদের পছন্দ হলো না। মাদক ব্যবসার জন্য বিরাট হুমকি হয়ে পড়লো মুন্না। তাই ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রিঃ পূর্বপরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র নিয়ে আনুমানিক রাত সাড়ে দশটার সময় হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়। মুন্না ও তার মা’কে হত্যা করাই ছিলো ওদের উদ্দেশ্য। ঘরবাড়ি ভাংচুর করে সন্ত্রাসীরা।

আক্রান্ত হওয়ার পর ৯৯৯ এ ফোন করে সহযোগিতার আশ্বাস পেলেও বাস্তবে পাশে ছিলো না কেউ। মাদক ব্যবসায়ীচক্রের ভয়ে স্থানীয় কেউই আসেনি তাদেরকে উদ্ধার করতে। ফেসবুক স্ট্যাটাসে মুন্না সাহায্য চাইলে, স্থানীয় একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এসে স্ট্যাটাস ডিলিট করতে বাধ্য করেন। দুই দিন গৃহবন্দী থাকার পর চট্টগ্রাম ৩ আসনের এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর আবারো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয় মুন্নাকে। বাড়িতে এলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। স্পোর্টিং ক্লাবের সদস্যদের ভয় ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়া করা হয়। বন্ধ হয়ে যায় স্পোর্টিং ক্লাবের সকল কার্যক্রম।

মাদকের থাবা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষার স্বপ্নটা থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো মাদক সন্ত্রাসীরা। হামলা হুমকি ধমকি সত্ত্বেও মুন্না থেমে যায়নি। নিজের অর্থ শ্রম মেধা ব্যয় করে মাদকবিরোধী জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মাদকের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছেন জনমত। লিফলেট তৈরি করে ছুটে বেড়ান সন্দ্বীপের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। স্কুল কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করেন। মাদকবিরোধী শপথবাক্য পাঠ করান। শতাধিক মসজিদে জুমার খুৎবায় মাদকবিরোধী বয়ান ও লিফলেট বিতরণের ব্যবস্থা করেন নিজ উদ্যোগে। হাট-বাজারে গিয়ে মাদকবিরোধী জনসচেতনতামূলক পথসভাও বাদ যায় নি কাজের তালিকা হতে। “একটি বজ্রকন্ঠ ও মাদকমুক্ত প্রজন্ম” শিরোনামে একটি বইও লিখেছেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মাদকবিরোধী এই কর্মযজ্ঞের খবর। অনলাইনকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সচেতন তরুণদের নিয়ে বর্তমানে মাদকের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছেন শামসুল আজম মুন্না। গড়ে তোলেন “মাদকমুক্ত তারুণ্য চাই” নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বর্তমানে দেশের ১৫ টি জেলায় কাজ করছে সংগঠনটির সদস্যরা। শামসুল আজম মুন্নার অদম্য নেতৃত্বে সমগ্র বাংলাদেশে মাদকবিরোধী সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে যাচ্ছে এই সংগঠন।
দেশের সকল নাগরিককে যার যার পেশাগত অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মুন্না। প্রতিটি ঘরে মাদকবিরোধী দুর্গ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন এই অদম্য তরুণ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *