মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পারলে মুজিব বর্ষ স্বার্থক হবে

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পারলে মুজিব বর্ষ স্বার্থক হবে

ডেস্ক নিউজ:

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, একজন রাজনীতিকের মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু একজন সাহিত্যিক, নাট্যনির্মাতার ক্ষমতা অনেক। দীর্ঘদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের মধ্যে ধারণ করার কাজটা করতে পারেন এসব শিল্প-সাহিত্যের মানুষেরাই। মানুষ এ চেতনাকে ধারণ করতে পারলেই মুজিব শতবর্ষ পালন স্বার্থক হবে।

রোববার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আহ্বায়ক ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর সেকুলার বাংলাদেশ ফিনল্যান্ডের ড. শুজিবুর দফতরি, অনলাইন এক্টিভিস্ট শাকিল রেজা ইফতি প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন। সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির। মূলপ্রবন্ধ পাঠ করেন চলচ্চিত্রনির্মাতা ও নাট্যনির্দেশক মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ।

সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। শুধু তাই নয়, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানও। কারণ আমি ও আমার বাবা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। কাজ করতে করতে আজ এই পর্যায়ে এসেছি। মুজিববর্ষে কবি সাহিত্যিকদের ভূমিকা হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে তাদের কাজই টিকে থাকবে। একটা মানবিক মূল্যবোধ তৈরির কাজে আপনাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আগেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোকেরা রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি বিপুলভাবে কাজ করেছেন। দেশ স্বাধীনের লক্ষ্যটা তারা অনেকখানি দেখিয়ে দিয়েছেন। বক্তৃতার মাঠ, গণসঙ্গীতের আসর, নাটক, কবিতা মুক্তির বাণীর কথা প্রচার করতো। যেটা মুক্তিযুদ্ধে সত্যিকার অর্থে আমাদের শক্তি জুগিয়েছিল। মুজিব শতবর্ষে এসে গানের মানুষ, বুদ্ধিজীবীরা, সাহিত্যিকেরাও শক্তি জোগানোর সেই বড় কাজটা আবার করতে পারেন।

টিপু মুনশি আরো বলেন, একজন রাজনীতিকের মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু একজন সাহিত্যিক, নাট্যনির্মাতার ক্ষমতা অনেক। দীর্ঘদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের মধ্যে ধারণ করার কাজটা করতে পারেন এসব শিল্প-সাহিত্যের মানুষেরাই। মানুষ এ চেতনাকে ধারণ করতে পারলেই মুজিব শতবর্ষ পালন স্বার্থক হবে।

জনপ্রিয় লেখক জাফর ইকবাল বলেন, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত টেলিভিশনে কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয়নি। কাজেই বাংলাদেশের মাটিতে যদি এইটা হতে পারে। যে মানুষটা আমাদের জাতির পিতা, আমাদেরকে বাংলাদেশটা উপহার দিয়েছে, সেই মানুষটাকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং মানুষ বঙ্গবন্ধুকে চিনতে পারে না। সেই দেশে এই ধরনের ঘটনার ভবিষ্যতে যেন কখনও পুনরাবৃত্তি ঘটতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের।

অধ্যাপক জাফর ইকবাল আরো বলেন, আমরা এখন মুজিববর্ষ পালন করছি। বিভিন্ন মানুষজনের সাথে কথা বললে অনেক সময় হাল্কাভাবে বোঝা যায়, যেভাবে এই মুজিববর্ষ পালন করা হচ্ছে অনেকের কাছে যেন মনে হয়, সেটা অনেক বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে- এটা আমি টের পাই অনেকের কথা-বার্তা দেখলে। কিন্তু আমি মনে করি যে, এটার খুব প্রয়োজন ছিল। আমরা যেভাবে পালন করছি তার থেকে আরও বেশি করে পালন করতে হবে।

সূচনা বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শাহরিয়ার কবির বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। শুধু রাষ্ট্র ও রাজনীতি ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে, কোনো বিশেষ ধর্মকে প্রশ্রয় দেবে না। বঙ্গবন্ধুর ঋণশোধ করার একটা পথ রয়েছে। সেটি হচ্ছে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার বাস্তবায়ন করা। যে কারণে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। মুজিববর্ষ পালনে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজেরও করণীয় আছে।

মূলপ্রবন্ধে চলচ্চিত্রনির্মাতা ও নাট্যনির্দেশক মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু শুধু একজন রাজনীতিকই ছিলেন না-তিনি ছিলেন একজন বড় রাজনিতিক কবি। তার ৭ মার্চের ভাষণ একটি কবিতা। রাজনীতির বাইরে কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে ছিল তার নিবির যোগাযোগ। তিনি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ এমন একটি গানকে তিনি দেশের জাতীয় সঙ্গীত করেছেন। এখান থেকেই বুঝে নিতে হবে তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিও ছিলেন।

স্মারক বক্তৃতায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ আরো বলেন, আসুন ‘৭২ এর সংবিধান প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধশালী, আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে আমাদের সৃষ্টিশীলতার পূর্ণ ব্যবহার করি। ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। এ পথে মৌলবাদী একাত্তরের পরাজিত শক্তি হন্তারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এ পথে মৃত্যু ঘাপটি মেরে আছে। কিন্তু আমরা থামবো না। আমরা ঐতিহ্যের শক্তিতে মুক্তির পথে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *