“মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কথা”(বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম হাওলাদার)

“মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কথা”(বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম হাওলাদার)

তাজা খবর

১৯৭১সালের ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা সংগঠিত হয়ে রায়পুর থানার হায়দারগঞ্জ এলাকায় ২৯ শে মার্চ সংগ্রাম নামে একটি কমিটি গঠন করি। প্রাথমিকভাবে ৮ জন সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করি। এরপর কমিটি গঠন করে আমরা ৮ জন মিলে দেড় মাসের মধ্যে সর্বমোট ৮২ জন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে যারা পুলিশ,আর্মি,আনসার; এই তিন বাহিনীতে কর্মরত ছিল তাদের সংগ্রহ করি এবং কুমিল্লার বর্ডার সংলগ্ন ভারতের চত্রাখলার তাজিয়া টিলাতে প্রবেশ করি সাংগঠনিক এবং পরিকল্পিত যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য। সেখানে রায়পুর নিবাসী মাওলানা আবুল আলা ইকতে হাদি ও মাহবুব মাস্টারের সাথে যোগাযোগ করি। তারপর উনাদের নিকট সেই ৮২ জন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তর করি। এরপর আমি নিজে ভারতের অম্পিনগরে অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য যাই। অম্পিনগর ক্যাম্পে ৩ সপ্তাহ ধরে অস্ত্রের (৩ নট ৩, মারক-৪,এস এল আর, অটোমেটিক এস এল আর,স্ট্যান্টগান,এল এম জি, টুইঞ্চি মটর, হ্যান্ড গ্রেনেড ) প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ শেষে অম্পিনগর থেকে আমি রাজনগর ক্যাম্পে যোগদান করি এবং বাংলাদেশে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষা করি। এমতাবস্থায় উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য আমাকে নির্বাচিত করা হয় এবং বি এল এফ হেডকোয়ার্টার, আগারতলায় প্রেরণ করা হয়। সেখানে প্রায় দেড় মাস ধরে যুদ্ধকালীন কমান্ড, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার এবং ওয়্যারলেস পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে আমাকে কোম্পানির সিনিয়র হিসেবে বিশ্রামগঞ্জ ক্যাম্পে প্রেরণ করা হয়। সেখানে আমার নেতৃত্বে বাঁশ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এরপর বিশ্রামগঞ্জ থেকে আমাকে নিয়মিত যৌথবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং আমরা ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার অরবিন্দ বিশ্বাস ও বাংলাদেশী মেজর খালেদ মোশাররফ এবং মেজর হায়দার এর নেত্রিত্বে নির্ভাহপুর হয়ে ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রবেশ করি। সেদিন দিবাগত রাত্রি ২ ঘটিকায়, অর্থাৎ ৩রা ডিসেম্বর আমি নিয়মিত যৌথবাহিনীর ( ভারত-বাংলাদেশ) সাথে নির্ভাহপুর সাব-সেক্ট্রে বাংলাদেশে ঢোকার জন্য অবস্থান করচিলাম। কারণ পাকবাহিনীর প্রতিরোধের ফলে আমরা যৌথবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছিলাম না। এমতাবস্থায়, ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার অরবিন্দ বিশ্বাস আমাকে বললেন-“ বলত গেরিলা এখন কি করা যায়?”
আমি বললাম- “স্যার আমাদের এফ এফ (ফ্রীডম ফাইটার) থাকলে কোন ব্যবস্থা করতে পারতাম।”
তখন ভারতীয় বাহিনীর একজন সৈনিক বলল –“ বহু মুক্তিযোদ্ধা বর্ডারে ঘোরাঘুরি করছে, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করতে পারছে না।”
আমি বললাম –“তাঁদেরকে (মুক্তিযোদ্ধা) কি সংগ্রহ করা সম্ভব?”
সৈনিক বলল- “চেষ্টা করে দেখতে পারি।”
সেইমতে ভারতীয় সৈনিক তার সাথে আরো কয়েকজন সৈনিক একত্রিত হয়ে প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে ৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রহ করে আমাদের সামনে হাজির করে।
তখন মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্য করে বললাম-“দেশের জন্য কি প্রাণ দিতে তোমরা প্রস্তুত?”
সবাই তখন এক স্বরে বলে উঠল- “আমরা দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত”
তখন তাদেরকে বললাম-“তোমরা সবাই তোমাদের গামছার ভিতরে যত সম্ভব গ্রেনেড সংগ্রহ কর। তোমাদের দুই হাতে দুইটা গ্রেনেডের ডেটেনেটর খুলে ক্লোরিং করবে এবং শত্রুদের বাঙ্কারের ভিতরে গ্রেনেড নিক্ষেপ করবে। তোমরা গ্রেনেডের ডেটেনেটর খুলে রাখবে যাতে করে আক্ষাত প্রাপ্ত হলে তা ছুঁড়ে দিবে শত্রুদের দিকে।”
সেইমতে তারা ক্লোরিং করে অগ্রসর হতে লাগল এবং প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে গ্রেনেডের এবং গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেল। তারপর ক্রমান্বয়ে পাকবাহিনীরা পিছিয়ে যেতে লাগল এবং আমরা নিয়মিত যৌথবাহিনীরা বাংলাদেশের ভিওরে প্রবেশ করতে লাগলাম।
পূর্ব আকাশে যখন সূর্য উঠছিল,তখন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মাত্র ৬ জন ফেরত আসল এবং তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে বাকিরা শহীদ হয়েছে। সেইমুহূর্তে আমরা বাংলাদেশের ভিতরে অগ্রসর হতে লাগলাম। এরপর ক্রমান্বয়ে লাকসাম, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর জয় করলাম তখন ডিসেম্বরের ৮ তারিখ এবং পরবর্তীতে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের তের বেঙ্গল অফিসে অবস্থান করলাম।
হৃদয়বিদারক কথা হল যে, স্বা্ধীনতার প্রায় ৪৮ বছর পার হতে চলল ,কিন্তু ঐ শহীদ ৫৩ জন এবং গাজী ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাদের আজ পর্যন্ত কোনো খবর জানতে পারলাম না।

“বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম হাওলাদার”
সাবেক সদস্য (সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ)।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *