মূল্যস্ফীতি

মূল্যস্ফীতি কমাতে সংকোচনের মুদ্রানীতি

তাজা খবর:

নতুন মুদ্রানীতিতে সংকোচনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রাধান্য দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে।

দেশের বহুমুখী অর্থনীতি কঠিন সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি রয়েছে, এমনটি খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে নেতিবাচক ধারায় ছিল দেশের অর্থনীতি।

এখনো মুদ্রা বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি খেলাপি ঋণ বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে চলমান উদ্যোগের পাশাপাশি বাজার থেকে অর্থের জোগান আরো কমাতে নীতি সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য এই নীতি সতর্ক ও সংকুলানমুখী।

সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি ডলারের বিনিময়মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্রোলিং পেক নামে নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পদ্ধতি দেশীয় মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয়ের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মুদ্রা বিনিময় হারকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামার অনুমতি দেওয়া হবে।

এত দিন নানা উদ্যোগ নিয়েও কমাতে পারেনি মূল্যস্ফীতি।

গত বছরের বেশির ভাগ সময় মূল্যস্ফীতি ছিল সাড়ে ৯ শতাংশের ওপরে। কখনো আবার একেবারে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশের ওপরে উঠেছিল। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা উদ্যোগ নিয়েছে, আইএমএফের পরামর্শেও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে আশানুরূপ কমেনি মূল্যস্ফীতি।

এবার অর্থবছরের মাঝপথে এসেও সেই মূল্যস্ফীতি কমাতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামবে বলে আশা করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলনকক্ষে জানুয়ারি-জুন সময়ের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান। এরপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় মুদ্রা সরবরাহনির্ভর নীতি থেকে সরে এসে সুদহার লক্ষ্য করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন শুরুর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে চলতি অর্থবছরের প্রথম মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহারের করিডর প্রথা চালু, সুদহারের সীমা প্রত্যাহার, ডলারের একক দাম, রিজার্ভের প্রকৃত হিসাবায়নসহ নানা উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে।

যদিও এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেছিলেন, তাঁরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। ফলে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে চলে আসবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.৪১ শতাংশ। যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ১.৫ শতাংশ বেশি।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিতিশীলতাকে কেন্দ্র করে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা, বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা, বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং মন্দ ঋণকে মূল্যস্ফীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সুদহার

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে অর্থ সরবরাহভিত্তিক থেকে মুদ্রানীতির থেকে সরে এসে সুদহারভিত্তিক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে, নীতি সুদহার ৬ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৬.৫০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু এতেও মূল্যস্ফীতি না কমায় গত ছয় মাসে বেশ কয়েকবার নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত ২৭ নভেম্বর নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৭.৭৫ শতাংশ করা হয়। গতকাল যা আরো ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করা হয়েছে।

মূলত নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদহার বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণত ঋণের চাহিদা কমে যায়। এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কমে গেলে মূল্যস্ফীতির সূচক মাথা নামাতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। সে কাজের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে, নীতি সুদহার বাড়ানো বা কমানো।

এদিকে নীতি সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিপরীত নীতি সুদহার ৫.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬.৫০ শতাংশ করা হয়েছে। যদিও কিছুটা কমানো হয়েছে বিশেষ নীতি সুদহার। ৯.৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৯.৫০ শতাংশ।

নীতি সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা ও নিম্ন সীমার মধ্যে ব্যবধান ২০০ শতাংশ পয়েন্ট থেকে কমিয়ে ১৫০ শতাংশ পয়েন্টে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ নীতি সুদহার ৮ শতাংশের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১৫০ বেসিস পয়েন্ট যোগ করে এসএলএফ সুদহার ও নিচে ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বিয়োগ করে এসডিএফ সুদহার নির্ধারণ করা হবে।

ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে

বাজারে অর্থের জোগান কমাতে মুদ্রানীতির সব লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। ২০২৪ সালের জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১১ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ের জন্য সরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭.৮ শতাংশ, যা এর আগে ৩১ শতাংশ নির্ধারণ করা ছিল। নতুন মুদ্রানীতিতে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। তবে এই পদ্ধতিতে ডলারের বিনিময় হার কত হবে, তা বলা হয়নি। পরে তা জানানো হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়।

রেকর্ড মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, ১২ বছরের মধ্যে রেকর্ড ৯.৯৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয় গত বছরের মে মাসে। অথচ এর আগের বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি সব সময় ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যেই ছিল। মে মাসের পর থেকে প্রতি মাসেই সাড়ে ৯ শতাংশের ওপরে ছিল মূল্যস্ফীতি। গত আট মাসের মধ্যে গত নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির এই পারদ সাড়ে ৯ শতাশের নিচে নামে। ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.৪১ শতাংশ।

যা বললেন গভর্নর

মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সময়ের প্রয়োজন। এটা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সময় লেগে যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে নেওয়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও আগের চেয়ে বাড়েনি।

গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অগ্রাধিকারে রেখে এবারও মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এবারের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রশমন, বিনিময় হার চাপ নিয়ন্ত্রণ, সরকারের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অর্থের সরবরাহ নিশ্চিত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে ঋণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

গভর্নর আব্দুর রউফ বলেন, আসছে জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ লক্ষ্যে নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকগুলো যে টাকা ধার করবে, তার সুদহার বাড়বে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক আরো সংকোচনমূলক মুদ্রা সরবরাহের দিকে হাঁটছে।

মুদ্রানীতির খসড়া পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপনকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা, উচ্চহারের খেলাপিতে লাগাম টানা, ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার তিন চ্যালেঞ্জ অগ্রাধিকার পাচ্ছে নতুন মুদ্রানীতিতে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাজারে অর্থের জোগান কমানোর দিকে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই লক্ষ্যে নীতি সুদহার আবারও বাড়িয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান, এ কে এম সাজেদুর রহমান খান, আবু ফরাহ মো. নাছের ও নুরুন নাহার, নির্বাহী পরিচালক খোরশেদ আলম, মুখপাত্র মেজবাউল হক প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *