রাজস্ব বাড়াতে রূপরেখা

তাজা খবর:

রাজস্ব আদায় বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ নির্দেশনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে রূপরেখা প্রণয়ন করে পরিকল্পিতভাবে রাজস্ব আদায়ে মাঠে নামবে এনবিআর।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হচ্ছে সক্ষম হওয়ার পরও ফাঁকি দিলে করদাতা যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন, রাজস্ব আদায়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। কঠোরতার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে এনবিআরকে সৃজনশীল ও উৎসাহমূলক নতুন কার্যক্রম গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজস্ব আদায়ের নতুন নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে বলেছেন তিনি। কোনো ধরনের অজুহাত না দেখিয়ে এনবিআরকে বছরের পর অনিষ্পত্তি হওয়া রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তিতে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায়। রাজস্ব আদায় বাড়াতে এসব পদক্ষেপ গ্রহণসহ আরও কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সামনে রেখে এরই মধ্যে এনবিআর রূপারেখা প্রণয়নের কাজ সেরে ফেলেছে, যা অর্থমন্ত্রীর কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর এনবিআরের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়ে বাস্তবায়নে নির্দেশ দেওয়া হবে। প্রতি ১৫ দিনে নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। নির্দেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধানকে এনবিআর চেয়ারম্যান কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনবেন।

উল্লেখ্য, কর-জিডিপি অনুপাত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে করব্যবস্থা সংস্কার, অব্যাহতি হ্রাস ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর রূপরেখা জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বাংলাদেশকে ঋণ অনুমোদনের সময় নানা শর্ত দিয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রাজস্ব বাড়ানোর শর্ত অন্যতম।

এনবিআর সদস্য মইনুল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এনবিআর রাজস্ব আদায়ে অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন কৌশল নিয়ে কাজ শুরুর প্রস্তুতি নিয়েছে। জোরেশোরে কাজ শুরু করা হবে।

প্রসঙ্গত, বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকট চলছে। আমদানি-রপ্তানিতে এখনো স্বাভাবিক ধারা আসেনি। রিজার্ভ কমেছে। উন্নয়ন কর্মসূচিতে গতি আসেনি। দেশের বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলছেই। আর্থিক সংকটের কারণে এরই মধ্যে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে অনেক প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও স্থগিত করেছে। অর্থবছরের প্রথম মাসেই সরকার ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। বিদেশি সহায়তা ও ঋণ জোগাড়েও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে অর্থ জোগাড়ে জোর বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে আছে প্রায় ৪৪ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে বেশি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশি^ক মন্দার প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। আর এতে রাজস্ব আদায়েও ধস নেমেছে। কিন্তু সরকারের খরচ তো থেমে থাকে না। এরই মধ্যে সরকার ঋণ নিয়েছে। সহায়তার জন্যও চেষ্টা করছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে রাজস্ব আদায়ে জোর বাড়াতেই হবে। কোনো বিকল্প নেই। এনবিআরকে নতুন কৌশলে রাজস্ব আদায়ে মাঠে নামতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, বছর বছর এনবিআরের ঘাটতি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘাটতি বেড়েই চলেছে। গতবারের ঘাটতি তার আগের অর্থবছরের চেয়ে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে বড় অঙ্কের ঘাটতি মেনে নেওয়া হবে না বলেও এনবিআরকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে এনবিআর প্রণীত রূপরেখায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কর ফাঁকিবাজ নামিদামি রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী বা পেশাজীবী বা যেই হোন না কেন, তার কাছ থেকে এনবিআরের কোনো দপ্তর রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হলে দায়ী কর্মকর্তা বা কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এনবিআরের তিন গোয়েন্দা শাখার তৎপরতা বাড়ানো হবে। অভিজাত এলাকার বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের কর পরিশোধের তথ্য যাচাইয়ে জোর বাড়ানো হবে। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ভ্যাট ফাঁকিবাজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে রাজস্ব জালে আনা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্যভা-ার ব্যবহার করে গাড়ির মালিকদের নিয়মমতো রাজস্ব পরিশোধে বাধ্য করা হবে। বিশেষভাবে চলতি অর্থবছরে নতুনভাবে নির্ধারিত কার্বন কর, অগ্রিম কর এবং নবায়নের কর পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখা। নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে করযোগ্য করদাতা চিহ্নিত করা হবে।

রূপরেখায় আরও বলা হয়েছে, মামলা জটে আটকে থাকা মামলা নিষ্পত্তিতে বিকল্প বিরোধ আইনের আওতায় আনাসহ নতুন কৌশল তৈরি করা হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় (বন্ড) পণ্য আমদানি-রপ্তানির তথ্য খতিয়ে দেখায় জোর বাড়ানো হবে। ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের তথ্য যাচাইয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ভ্যাট আদায়ে ইএফডি যন্ত্র সরবরাহে প্রয়োজনে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। অর্থনৈতিক লেনদেন বেশি হয় এমন ‘গ্রোথ সেন্টার’ থেকে রাজস্ব আদায়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে।

রাজস্ব আদায় নজরদারিতে মাঠপর্যায়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের পরিদর্শন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে রূপরেখায় বলা হয়েছে, যেসব ব্যবসা বা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান শুল্ক-ভ্যাট বকেয়া রেখেছে বা ফাঁকি দিয়েছে তার তালিকা করে এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা হঠাৎ উপস্থিত হয়ে হিসাবপত্র জব্দ করবেন। প্রাথমিকভাবে সেখানে বসেই খতিয়ে দেখে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হবে। এরপর তা আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত তদন্তে পাওনার পরিমাণ কম বা বেশি হলে তা সমন্বয় করা হবে অথবা ফেরত দেওয়া হবে। চলতি বাজেটে কর, ভ্যাট ও শুল্ক খাতে নতুন যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে আদায় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

রূপারেখায় বলা হয়েছে, অর্থ পাচারকারীদের আইনগত শাস্তির পাশাপাশি সামাজিকভাবেও শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। দুর্নীতির তদন্ত শেষে পাচারকারী এবং চোরাকারবারিদের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।

রাজস্ব বাড়াতে কর এজেন্ট নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের শহরের পাশাপাশি গ্রামেও পাঠানো প্রয়োজন মনে করছে এনবিআর। সম্ভাবনাময় বৃহৎ ও মাঝারি করদাতা চিহ্নিত করতে জোর দেবে সংস্থাটি। উৎসে রাজস্ব আদায়ে আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম মনিটরিং, আমদানি-রপ্তানিতে অবমূল্যায়ন সম্পর্কিত কার্যক্রম কঠোর নজরদারি করা হবে। করদাতাদের সেবা বৃদ্ধি ও করদাতাদের সঙ্গে (খাতভিত্তিক) আলোচনার মাধ্যমে কর দিতে উৎসাহিত করা হবে। অনিবন্ধিত নতুন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনের সহায়তা নিয়ে এরপর প্রতিষ্ঠানকে রাজস্ব জালে আনা এবং হিসাবমতো রাজস্ব পরিশোধে বাধ্য করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *