রোহিঙ্গায় অপরাধ বেড়েছে উখিয়া-টেকনাফে

রোহিঙ্গায় অপরাধ বেড়েছে উখিয়া-টেকনাফে

তাজা খবর:

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের সীমান্ত জেলা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা। এতো বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কারণে এরই মধ্যে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা অবনতিসহ মানবপাচার, খুন, অপহরণ, সোনা চোরাচালান, মাদকদ্রব্য পাচার বিশেষ করে ইয়াবা কারবার ও নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। মোটকথা, অপরাধের হটস্পট হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

এদিকে, দিন যতই যাচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এ সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। এমনকি ক্যাম্পের ভেতর থেকে অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে লোকালয়েও। অপকর্ম, মানব পাচার, ইয়াবা কারবার ও খুনের মতো কার্যকলাপও বেড়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চোরাচালান, সন্ত্রাস অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়সহ যাবতীয় অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন আরসা (ARSA) বা আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (Arakan Rohingya Salvation Army)। এর আন্তর্জাতিক নাম হারাকাহ আল-ইয়াকিন (Harakah al-Yaqin)। এ সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন আতাউল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। যার জন্ম পাকিস্তানে। তিনি এখন কোথায় আছেন, কি করছেন বা তার সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা নিয়ে শুধু প্রশ্নই উঠেছে। মরণনেশা ইয়াবা কারবারসহ নানা অপরাধ করাই হচ্ছে এ সংগঠনের মুখ্য উদ্দেশ্য- এমনটাই মনে করছেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি।

সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর রোহিঙ্গা সংকট আরো ঘনীভূত ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আতাউল্লাহ বাহিনীর শতাধিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে ও পাহাড়ের গহীন অরণ্যে সশস্ত্র মহড়া দিচ্ছেন। এদের মধ্যে, হাকিম ডাকাত, নবী হোসেন, আবদুল্লাহ, নুর উদ্দিন, কামাল, নুর কামাল, শফিউল্লাহ ও হামিদুর রহমান উল্লেখযোগ্য। এসব সন্ত্রাসীরা মাঝে মধ্যে উড়োচিঠি, হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষদের।

উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, যেকোনো সময় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে পারে রোহিঙ্গা শিবিরকে কেন্দ্র করে। এরই মধ্যে এর আলামত দেখা গেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আচার-আচরণে তা প্রকাশও পাচ্ছে।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনের সভাপতি গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, আমার ইউনিয়নেই সাড়ে ৮ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। প্রতিদিন নানা আপত্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের। প্রতি রাতে আমার ইউনিয়নের কোনো না গ্রাম থেকে চিহ্নিত করে লোকজন ধরে নিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। রাত হলেই ইয়াবার হাট বসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। আমরা অনেকটা জিম্মি রোহিঙ্গাদের কাছে। কারণ রোহিঙ্গারা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত আইনের আওতায় তাদের বিচার করার ক্ষমতা ইউনিয়ন পরিষদের নেই।

হোয়াক্ষং ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমেদ আনোয়ারী ও হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী ও টেকনাফের বাহার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজ উদ্দিনের একই কথা; তারা বলছেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ভয়ে প্রতিটি গ্রামে পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছে গ্রামবাসীরা। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় উখিয়া-টেকনাফের অধিকাংশ বাসিন্দা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাই পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যাবার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

তবে এতোসব অপকর্ম রুখতে সজাগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সম্প্রতি র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও এপিবিএন যৌথ অভিযান চালিয়ে উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে কয়েক দফা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা বারুদ উদ্ধার করেছে। এ অভিযান এখনো চলছে। গত চার বছরে ৫৭ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও বন্ধ হয়নি তাদের অপকর্ম।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের এসপি হাসানুজ্জামান ডেইলি বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, পার পাবার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উগ্র জঙ্গিবাদ, নাশকতা ও যেকোনো প্রকার মাদক চোরাচালান এবং মানবপাচার কঠোরভাবে দমন করা হবে।

কক্সবাজার ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের এসপি তারিকুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এপিবিএন সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ অপরাধ দমনে কাজ করছেন। এছাড়া তিনটি তল্লাশি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসমূহে। প্রায় প্রতিদিন উখিয়া-টেকনাফের কোনো না কোনো স্থানে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, আইস ও সোনার বার উদ্ধারের মতো ঘটনা ঘটছে। হয়ত কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকতে পারে। তবে সফলতার তালিকা খুব একটা কম না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *