লিঙ্গ পরিচয়

শরিফ থেকে শরিফাঃ হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স এবং লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি ও তার সমাধান

শেখ মোঃ মমিনুল ইসলাম (মুন):

কবি-গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “পরিচয়” কবিতায় লিখেছিলেন;
“একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে,
বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে।
তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি
পরিচয় কোনো আছে নাকি?
যাবে কোনখানে?
আমি শুধু বলেছি, কে জানে?”

আচ্ছা, যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়ঃ “আপনার পরিচয় কী?” আপনি তখন কি উত্তর দেবেন? নিশ্চয়ই আপনার নাম, পেশা, জাতীয়তা, ঠিকানা ইত্যাদি বলবেন, তাই না? কিন্তু কেন বলবেন? কারণ হল সমাজ এভাবেই সবকিছু সৃষ্টি করেছে, সমাজ আমাদের একটি পরিচয় প্রদানের পদ্ধতি তৈরি করেছে, যেমন মানব সমাজ ভাষা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রতিটি মানুষের পরিচয় থাকাটা তার অস্তিত্বের বা সত্তার এবং ব্যক্তি-মর্যাদার বা Dignity-র স্বীকৃতি স্বরূপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আপনার যদি নাম না থাকতো এবং কেউ যদি আপনাকে “এই ছেলে” বা “এই মেয়ে” বলে ডাকতো, তাহলে কেমন লাগতো? প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ পরিচয় স্বতন্ত্র এবং এই “পরিচয়” খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা প্রতিটি মানুষকে বুঝতে, জানতে এবং একজন থেকে অপরজনকে পৃথক করতে সহযোগিতা করে। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হল আমরা সবাই মানুষ। আমরা অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীদের থেকে ভিন্ন। তাই আমাদের “পরিচয়” আমাদেরকে অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে। আমাদের পরিচয়ের মধ্যে আমাদের নাম, আমাদের পেশা, লিঙ্গ, জাতীয়তা, বংশ, ধর্ম, উচ্চতা, বৈবাহিক অবস্থা, জন্ম-স্থান, জন্ম তারিখ ইত্যাদি তথ্য থাকতে পারে। প্রয়োজন অনুসারে আমরা আমাদের পরিচয় সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করে থাকি। আমাদের পরিচয়ের সব তথ্য সব সময় প্রয়োজন নাও হতে পারে, যেমনঃ আপনি যদি প্রধানমন্ত্রী হন তাহলে আপনি নারী নাকি পুরুষ সেটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল আপনার ভিতরে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা আছে কিনা। আমাদের পরিচয়ের মধ্যে “লিঙ্গ” (Sex এবং Gender) একটি বিশেষ বিষয়। এই বিষয়টি কারো কারো নিকট অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং কারো কারো নিকট খুবই সাধারণ ও নিতান্তই অগুরুত্বপূর্ণ। তবে লিঙ্গ নিয়ে কথা বলা দরকার, কারণ বর্তমানে অনেক মানুষ এই লিঙ্গ পরিচয় (Sex এবং Gender) নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। আমি এই লেখনীটিতে এই Sex এবং Gender বিষয়গুলো সংক্ষেপে ও সরলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। প্রথমেই আসুন জেনে নেওয়ার চেস্টা করবো, Sex কি এবং Gender কি সে সব বিষয়। এরপর আলোচনা করবো; হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার, ইন্টারসেক্স, কোতি এবং সমকামিতা নিয়ে, যা ইদানিং খুব আলোচিত হচ্ছে। Sex (সেক্স) হল “জৈবিক লিঙ্গ” বা “দৈহিক লিঙ্গ”। অর্থ্যাৎ, মাতৃগর্ভে আমাদের সেক্স ক্রোমোজোমের (XX, XY ইত্যাদি) মাধ্যমে আমরা যে দৈহিক বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হই, আমাদের যৌনাঙ্গ ও প্রজনন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (যেমনঃ জরায়ু, অণ্ডকোষ, ডিম্বাশয় ইত্যাদি) গঠিত হয় এবং এগুলোকে বিবেচনায় রেখে আমাদেরকে “নারী” (Female) বা “পুরুষ” (Male) ইত্যাদি হিসাবে যেভাবে চিহ্নিত করা হয় তাই হল আমাদের দৈহিক বা জৈবিক লিঙ্গ, যাকে Sex (সেক্স) বলা হয়।

Sex (সেক্স) মূলতঃ তিন প্রকার। যথাঃ ১। নারী (Female/ফিমেইল), ২। নর (Male/মেইল), এবং ৩। আন্তঃলিঙ্গ (Intersex/ইন্টারসেক্স)।

১। নারী (Female/ফিমেইল) – মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে সেক্স ক্রোমোজম XX নির্ধারিত হলে সেই শিশুটির দৈহিক বা জৈবিক লিঙ্গ হয় নারী (Female/ফিমেইল)।

২। নর বা পুরুষ (Male/মেইল) – মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে সেক্স ক্রোমোজম XY নির্ধারিত হলে সেই শিশুটির দৈহিক বা জৈবিক লিঙ্গ হয় নর বা পুরুষ (Male/মেইল)।

৩। আন্তঃলিঙ্গ (Intersex/ইন্টারসেক্স) – মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে সেক্স ক্রোমোজম XXY কিংবা XYY ইত্যাদি নির্ধারিত হলে সেই শিশুটির দৈহিক বা জৈবিক লিঙ্গ হয় আন্তঃলিঙ্গ (Intersex/ইন্টারসেক্স)।

এই ধরণের শিশুর যৌনাঙ্গ এবং প্রজনন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুরোপুরি নারীর মত হয় না, আবার পুরোপুরি পুরুষের মতও হয় না। আন্তঃলিঙ্গকে ইংরেজিতে “Intersex” (ইন্টারসেক্স) বলা হয় এবং আরবীতে ও ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় “খুনসা”। পূর্বে আন্তঃলিঙ্গ বা ইন্টারসেক্সকে ইংরেজিতে বলা হতো “Hermaphrodite” (হারমাফ্রোডাইট)। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ আন্তঃলিঙ্গকে “তৃতীয় লিঙ্গ” বা “হিজড়া” নামে জানে। প্রকৃতপক্ষে, হিজড়া একটি পেশা বা সংস্কৃতি, এটি কোন লিঙ্গ নয়। তবে একটি হিজড়া ডেরায় আন্তঃলিঙ্গ মানুষ বসবাস করতে পারে, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। সকল হিজড়া আন্তঃলিঙ্গ নন, অনেক হিজড়া আছেন যারা মূলতঃ ট্রান্সজেন্ডার এবং কোতি। অনেকে ইন্টারসেক্স শব্দটির বাংলা অনুবাদ করেন “উভলিঙ্গ” বা “ক্লীবলিঙ্গ” ।

“তৃতীয় লিঙ্গ” শব্দটি এসেছে মূলতঃ হিন্দু শাস্ত্রে বর্ণিত “তৃতীয় প্রকৃতি” শব্দটি থেকে, যাকে “অর্ধনারীশ্বর” বলা হয়। ইন্টারসেক্স মানুষরা আবার নানা রকমের হতে পারেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন শ্রেণীতে তাদের ভাগ করে থাকেন।

যথাঃ Klinefelter syndrome, Turner syndrome, Jacobs syndrome, Mayer–Rokitansky–Küster–Hauser syndrome (MRKH syndrome) ইত্যাদি। আন্তঃলিঙ্গ বা ইন্টারসেক্সকে ইসলামি পরিভাষায় এবং আরবিতে “খুনসা” বলা হয়। খুনসা সাধারণত দুই রকম হয়: ১। খুনসা মুশকিলাহ, ২। খুনসা গাইরে মুশকিলাহ।

এবার আসুন, তাহলে দেখি Gender (জেন্ডার) কি। জেন্ডার হল আমাদের মনো-সামাজিক লিঙ্গ। জেন্ডারকে সৃষ্টি করেছে মানব সমাজ। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একটি সমাজের নারী-পুরুষের প্রত্যাশিত ভূমিকা ও আচরণকে জেন্ডার বলে। সমাজে একজন নারী-পুরুষ অথবা ছেলে-মেয়ে কী করবে, কী করতে পারবে না সমাজ কর্তৃক তা নির্ধারণ করে দেওয়াই হচ্ছে জেন্ডার।

জেন্ডার অনেক প্রকার হতে পারে। যথাঃ সিসজেন্ডার, টরান্সজেন্ডার, নন-বাইনারী, জেন্ডারফ্লুইড, জেন্ডার-কুইয়ার, অ্যাজেন্ডার, বাই-জেন্ডার, ডেমিজেন্ডার, প্যান-জেন্ডার ইত্যাদি। গবেষকদের মতে ৬০ প্রকারের বেশি জেন্ডার সারা বিশ্বে দেখা যায়। সমাজের বেশির ভাগ মানুষ হলেন সিসজেন্ডার, যারা “জেন্ডার-বাইনারী”-কে মেনে নিয়ে থাকেন। সিসজেন্ডার মানুষেরা সমাজ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া তাদের মনো-সামাজিক লিঙ্গ ও জৈবিক লিঙ্গ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। অর্থ্যাৎ, কেউ যদি পুরুষ (Male) হিসাবে জন্ম গ্রহণ করেন এবং সমাজও তাঁকে পুরুষের মতই জেন্ডার আরোপ করে এবং ঐ ব্যক্তি যদি সেই পুরুষ দেহ ও পুরুষ সামাজিক লিঙ্গকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে তিনি “সিসজেন্ডার পুরুষ” (Cis-gender Male)। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি পুরুষ (Male) হিসাবে জন্ম গ্রহণ করেন এবং সমাজও তাঁকে পুরুষের মতই জেন্ডার আরোপ করে এবং ঐ ব্যক্তি যদি সেই পুরুষ দেহ ও পুরুষ সামাজিক লিঙ্গকে নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকেন এবং তিনি তাঁর মনে বিপরীত লিঙ্গ মানে নারী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন এবং তাঁর মধ্যে একটি নারী সত্তা বিরাজ করে, তাহলে তিনি হলেন একজন “ট্রান্সজেন্ডার নারী” (Transgender Woman)। এই ক্ষেত্রে তাঁর দেহ যতই পুরুষালী হোক না কেন, তিনি “ট্রান্সজেন্ডার নারী” হিসাবে বিবেচিত হবেন, সেই ক্ষেত্রে তিনি শাড়ি-চুড়ি নাও পরতে পারেন কিংবা জেন্ডার পরিবর্তন করতে সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি (Sex Reassignment Surgeries) নাও করতে পারেন। টরান্সজেন্ডার ব্যক্তি যখন সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি করানোর মাধ্যমে তাঁর সেক্স বা দেহকে রূপান্তর করে ফেলেন, তখন তাঁকে বলা হয় “ট্রান্সসেক্সুয়াল” (Trans-sexual)। হিজড়া ডেরায় অনেক ট্রান্সজেন্ডার নারী এবং ট্রান্সসেক্সুয়াল নারী থাকতে পারেন। ক্রস-ড্রেসার, মেয়েলী পুরুষ বা কোতি, ট্রান্সজেন্ডার নারী ও ট্রান্সসেক্সুয়াল নারীদেরকে আরবিতে ও ইসলামি পরিভাষায় “মুখান্নাসুন” (مخنثون) (একবচন “মুখান্নাস”, বহুবচন “মুখান্নাসুন”) বলা হয়। এর অর্থ হল "মেয়েলী পুরুষ", "মহিলার বেশধারী পুরুষ"। “মুখান্নাসুন” হল ধ্রুপদী আরবিতে ব্যবহৃত একটি প্রাচীন প্রতিশব্দ, যা বর্তমানকালের রূপান্তরিত লিঙ্গের মহিলাদের আধুনিক ধারণার প্রাচীন শব্দটির সর্মাথক প্রতিশব্দ, যাদেরকে অতীতে জোর করে “খোজা” বা “নপুংসক” (Eunuch) বানানো হত। হিজড়া ডেরায় এখনও অনেক “খোজা” (Eunuch) বাস করেন, যাদেরকে পুরুষাঙ্গ কেটে বা Castration করে কিংবা জেনিটাল মিউটিলেশন (Genital Mutilation) করে “খোজা” করা হয়। এবার আসুন, জেনে নিই হিজড়া কারা। “হিজড়া” শব্দটি একটি আরবি শব্দ যার অর্থ হল “হিজরতকারী”; মানে হলঃ যারা একস্থান হতে অন্য স্থানে গমনাগমন করেন। হিজড়াদেরকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় “কিন্নর”, “শিখণ্ডী”, “বৃহন্নলা” ইত্যাদি। ভারতের অনেক স্থানে এখনও হিজড়াদেরকে “কিন্নর” বলেই জানে। ভারতীয় উপমহাদেশে, হিজড়া হল খোজা বা নপুংসক (Eunuch), আন্তঃলিঙ্গের মানুষ (Intersex) বা “খুনসা” কিংবা “ভাবরাজ”, বা ট্রান্সজেন্ডার মানুষ (Transgender/Trans-sexual), ক্রসড্রেসার (Cross-Dresser), কোতি বা মুখান্নাস ইত্যাদি মানুষ; যারা এমন সম্প্রদায়ে বাস করে যারা “গুরু-চেলা পদ্ধতি” নামে পরিচিত একটি আত্মীয়তার ব্যবস্থা অনুসরণ করে। এরা দক্ষিন ভারতে “আরাবাণী”, “অরুভানি” এবং “জোগাপ্পা” নামেও পরিচিত। পাকিস্তানে, হিজড়ারা “খাজা সিরা” নামে পরিচিত। অনেকে হিজড়া শব্দটিকে গালি হিসাবে ব্যবহার করে, যেমনঃ মাইজ্ঞ্যা, হিজড়া, ছক্কা ইত্যাদি। হিজড়াকে অনেকে “জেন্ডার” বা মনো-সামাজিক লিঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। অনেকে আবার বলে থাকেন যে, হিজড়া কোন লিঙ্গ নয়, হিজড়া হল একটি সংস্কৃতি বা কালচার, হিজড়া একটি ঐতিহ্য বা ট্র্যাডিশন, হিজড়া একটি জনগোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা কমিউনিটি; হিজড়া একটি জীবনযাত্রা বা লাইফ-স্টাইল; এবং হিজড়া হচ্ছে একটি পেশা বা বৃত্তি। হিজড়াদের নিজস্ব ভাষা আছে যার নাম “উল্টি”। উল্টি ভাষাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বলা হয় “গুপ্তি”, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি এবং পাকিস্তানে বলা হয় “হিজড়া ফার্সি” এবং নেপালে বলা হয় “ইয়োব্বান”। উল্টি একটি কোড ল্যাঙ্গুয়েজ বা গোপন ভাষা। এই ভাষা তৈরি হয় মুঘল আমলে। প্রাচীনকাল থেকে হিজড়াদেরকে অনেক সম্মান ও শ্রদ্ধা করা হয়ে থাকে ভারতীয় উপমহাদেশে। মুঘল যুগে হিজড়ারা বড় বড় রাষ্ট্রীয় পদে আসীন ছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশরা আসার পর থেকে হিজড়াদেরকে অনেক নির্যাতন করা হতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে হিজড়ারা ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহী সৈনিকদের সাহায্য করে। সে কারণে ১৮৭১ সালে ব্রিটিশরা একটি কালো আইন তৈরি করে যার নাম ছিল Criminal Tribes Act (CTA), 1871 (কৃমিনাল ট্রাইব অ্যাক্ট ১৮৭১)। এই আইনের মাধ্যমে হিজড়াদেরকে সমাজের সবচেয়ে নিচে টেনে নামিয়ে আনা হয়। এই আইন ব্যবহার করে হিজড়া এবং আদিবাসী ও যাযাবর জনজাতির মানুষদেরকে অনেক নির্যাতন করে ব্রিটিশরা। হিজড়াদেরকে এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষদেরকে দমন করতে ১৮৬০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভু মহারাণী ভিক্টোরিয়া একটি দণ্ডবিধি তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় “The Penal Code, 1860” এবং এই দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা মোতাবেক হিজড়াদেরকে বিকৃত- যৌনকামী হিসাবে সকলের নিকট উপস্থাপন করা হয় এবং শাস্তি দেওয়া ও নির্যাতন করা হয়। এই সকল ব্রিটিশ কালো আইন এখনও বাংলাদেশে বলবত আছে। যা হোক, হিজড়াদের মধ্যে গুরু- পরম্পরা প্রথা প্রচলিত আছে। হিজড়াদের অনেকগুলো ঘরানা আছে, যেমনঃ শ্যামবাজার, ঘুঙ্গুর, মাছুয়া ইত্যাদি। শিস্যদেরকে দীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে হিজড়া সংস্কৃতিতে প্রবেশ করানো হয়। হিজড়া জনগোষ্ঠীর ইষ্টদেবতারা হলেনঃ দেবী বহুচরা মাতা (মাঈজী তারামনি নামে প্রসিদ্ধ), দেবতা অর্ধ-নারীশ্বর (শিব ও পার্বতীর সমন্বয়), দেবতা ইরাবান বা আরাভান, দেবতা মুরুগান, দেবতা আয়াপ্পা ইত্যাদি। তবে হিজড়াদের মধ্যে অনেকেই মুসলমান। ঢোলপূজা, বারাইয়া ইত্যাদি হিজড়াদের প্রধান প্রধান উৎসব। হিজড়ারা কারো ক্ষতি করতে চান না, তবে ইদানিং অনেক “নকল হিজড়া” (যারা মূলতঃ পুরুষ) হিজড়ার বেশে অনেক অপরাধ কর্মে লিপ্ত হচ্ছেন বিধায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর বদনাম হচ্ছে। অনেক বহিরাগতরা অপরাধ কর্মে লিপ্ত হচ্ছেন কিন্তু বদনাম হচ্ছে হিজড়াদের। আসলে ভালোমন্দ সব সম্প্রদায়ের মাঝে আছে, তাই ঢালাওভাবে কাউকে দোষারোপ করা উচিৎ হবে না। হিজড়ারা কিংবা ট্রান্সজেন্ডাররা কি সমকামী? না, সমকামিতা ভিন্ন বিষয়, সমকামী নারীদেরকে বলা হয় “লেসবিয়ান” এবং সমকামী পুরুষদের বলা হয় “গে”, বাইসেক্সুয়াল হল উভকামী নারী কিংবা পুরুষ। যৌনতা দিয়ে কারো লিঙ্গ পরিচয় গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশের মানুষ হিজড়াদেরকেই তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে মনে করেন। কিন্তু “তৃতীয় লিঙ্গ” বা “থার্ড জেন্ডার" শব্দ দুইটি খুবই আপত্তিকর ও বৈষম্যমূলক। কারণ, হিজড়ারা তৃতীয় লিঙ্গ হলে প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্গ তাহলে কারা? এই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় লিঙ্গ শ্রেণি-করণের কারনেই সমাজে লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা ও বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং হিজড়াদেরকে “তৃতীয় শ্রেণী”র নাগরিকে পরিণত করার প্রক্রিয়া সহজতর হচ্ছে। বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকই সমান অধিকার ভোগ করবে, তাহলে বৈষম্যকে কেন আমরা মাথাচাড়া দিতে সুযোগ দেবো? উপরের আলোচনা থেকে আমরা কি বুঝলাম? হিজড়া হোক, ট্রান্সজেন্ডার হোক, ইন্টারসেক্স হোক, নারী হোক, পুরুষ হোক, হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, খ্রিস্টান হোক, বৌদ্ধ হোক, বাঙ্গালী হোক, কিংবা পাহাড়ি হোক সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা “মানুষ”। তাই “শরিফ থেকে শরিফা” নিয়ে বিতর্ক না করে, আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সহনশীল, পরমতসহিষ্ণু, উদার ও মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে এগিয়ে আসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *