শৃঙ্খলা আনতে কর্তৃপক্ষ আসছে

তাজা খবর:

ডিজিটাল বাণিজ্য বা ই-কমার্স সঠিকভাবে পরিচালনায় নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন করবে সরকার। দেশে ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসার ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এই কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। এ ব্যাপারে আইন হচ্ছে। আইনের খসড়া অনুযায়ী প্রতারণার দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ।

ডিজিটাল বাণিজ্য খাতে শৃঙ্খলা আনতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ‘ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। গত বছর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স’ বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।

কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল বাণিজ্য বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তি, অপরাধ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ এবং অন্যান্য বিষয়ে সমাধান দেবে। এ ছাড়া আমদানিনিষিদ্ধ পণ্য ও সেবা কেনাবেচা ও সংরক্ষণ তদারকিতে পদক্ষেপ নেবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর কাজ শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে খসড়া আইনের বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত চাওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে গত রবিবার থেকে দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

দেশে কভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর থেকে গত কয়েক বছরে ডিজিটাল বাণিজ্য খাতের যেমন অনেক প্রসার ঘটেছে, তেমনি একই সময়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এই খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারি হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বাণিজ্য বিষয়ক আইন করার উদ্যোগ নিয়ে একটি খসড়া তৈরি করে মতামত চেয়েছিল। ওই সময় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ এই খাতের ব্যবসায়ী নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা বাদ দেওয়া হয়। ফলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বাণিজ্য আইন না করে এখন ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ আইন করতে চায়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, খসড়া আইনটির অধীনে ‘ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা হবে। আইনটি পাসের পর কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে সেখান থেকে লাইসেন্স নিয়ে দেশে ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে।

সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থা এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে খসড়া আইনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা আনতে কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে।

ডিজিটাল বাণিজ্যের অনলাইন কার্যক্রম ও সরেজমিন পরিদর্শন এবং এই বাণিজ্যের সম্প্রসারণে কর্তৃপক্ষ কাজ করবে, ডিজিটাল বাণিজ্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দেবে। এই খাতে শৃঙ্খলা রক্ষায় ক্রেতা ও বিক্রেতার অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারে ব্যবস্থা নেবে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান বা তদন্ত করার পাশাপাশি ওই কাজে কর্তৃপক্ষ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সহায়তা নিতে পারবে। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করলে নিবন্ধন বাতিল করবে কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষ গঠন ও কার্যক্রম

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এই কর্তৃপক্ষে একজন নির্বাহী চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য থাকবেন। এর প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায়। সরকার চাইলে ঢাকার বাইরে এক বা একাধিক শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে।

কর্তৃপক্ষের কাজে গতিশীলতা আনতে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, অধিদপ্তর, দপ্তর ও বিশিষ্ট নাগরিকের সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে।

পণ্যে মোড়কের সঠিক ব্যবহারবিধি, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়া অনলাইনে বেচাকেনা, অসত্য ও অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন বা বিক্রয় প্রস্তাব দিয়ে ক্রেতা ও গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার বিষয় তদারক করবে কর্তৃপক্ষ। ডিজিটাল বাণিজ্য প্রসারে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তাঝুঁকি ও প্রতারণা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে সরকারি ও বেসরকারি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরামর্শক প্যানেল গঠন করবে।

আইন অমান্য করলে শাস্তি ও জরিমানা

ডিজিটাল বাণিজ্যে প্রতারণার অপরাধে মামলা ও জরিমানা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। এতে সর্বোচ্চ জরিমানা পাঁচ লাখ টাকার বিধান রাখা হচ্ছে।

নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করলে ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেজ বন্ধ করা হবে। প্রথমবার ১০ হাজার টাকা এবং এরপর প্রতিবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। একইভাবে ওয়েবসাইটে ও পেজে নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শন না করলে একই হারে জরিমানা করা হবে বলে আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে।

খসড়া আইনে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী পণ্য ও সেবা সরবরাহ না করলে পরিশোধিত অর্থ গ্রাহককে ফেরত বা দ্বিগুণ ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে। একই কাজ বারবার করলে তিন গুণ অর্থ জরিমানা করা হবে। নিষিদ্ধ পণ্য ও সেবা অনলাইনে প্রদর্শন, সংরক্ষণ ও কেনাবেচা করলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে।

মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে অনলাইন বিক্রেতার জন্য প্রথমবার ১০ হাজার টাকা, পরবর্তী সময়ে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং পণ্য ও সেবার মূল্য ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হচ্ছে।

অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, তদারকি ও সরেজমিনে পরিদর্শনে অসহযোগিতা বা বাধা দিলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ বা এক লাখ টাকা জরিমানা ও উভয় শাস্তি দেওয়া হবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে চাওয়া তথ্য নির্ধারিত সময়ে কর্তৃপক্ষকে না দিলে তথ্য সংগ্রহের জন্য সব কিছু জব্দ এবং ওয়্যারহাউস বন্ধ বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এ আইনের যেকোনো ধারা লঙ্ঘনের দায়ে আদালতে মামলা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বিচার হবে।

ডিজিটাল বাণিজ্যে শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার যে উদ্দেশ্যে আইন করছে, একই উদ্দেশ্যে কাজ করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ডিজিটাল বাণিজ্যে যখন নানা প্রতারণার অভিযোগ ওঠে, তখন এই সংস্থা জনবলের অভাবে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। এমন অনেক সংস্থা ও বিদ্যমান আইন দিয়েই ডিজিটাল কমার্স নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নতুন করে আইন বা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হবে না।

তিনি বলেন, দেশে আইন ও কর্তৃপক্ষ থাকলেও অনলাইনে জুয়া চলছে, যেখানে দেশে জুয়া নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে কোনো কর্তৃপক্ষ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তেমন পদক্ষেপ না থাকায় এমন অবৈধ কাজ চলছে। তাঁর মতে, যেসব সংস্থা আছে, সেখানে জনবল বৃদ্ধি এবং কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দিলেই এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

শুরু থেকে ডিজিটাল কমার্স আইন করার বিরোধিতা করে আসছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ গঠনের জন্য একমত হয়েছে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ডিজিটাল বাণিজ্য দেখভাল করার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। এ জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করতে চায় সরকার। তিনি বলেন, ভোক্তার অধিকার নিয়ে কাজ করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ডিজিটাল বাণিজ্য প্রসার ও শৃঙ্খলা ধরে রাখতে আলাদা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন, যাতে এই খাতে নানা ধরনের প্রতারণা দূর করা সম্ভব হয়। ই-ক্যাবের নেতারা মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছেন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *