সিলেট গ্যাস ফিল্ড

সংকটে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে সিলেট গ্যাস ফিল্ড

তাজা খবর:

দেশে একদিকে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা, অন্যদিকে তীব্রতর হচ্ছে গ্যাসের সংকট। এমন ক্রান্তিকালে আশার আলো ছড়াচ্ছে সিলেট গ্যাস ফিল্ড। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত তিন মাসে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের অধীনে তিনটি কূপ খনন করে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে শিগগিরই আরও সুখবর আসবে। এমনকি সেখানে তেলের সন্ধান পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনাও রয়েছে।

সিলেটের রশিদপুর-২নং গ্যাস কূপ অনুসন্ধানে নতুন গ্যাস স্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার পরিমাণ প্রায় ১৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট। আগামী ১০ দিনের মধ্যেই এখান থেকে দৈনিক ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া হরিপুরের ১০ নম্বর কূপে গ্যাস পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনফুট। এখান থেকে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। আর কৈলাশটিলার পরিত্যক্ত ২নং কূপ থেকে ইতোমধ্যেই জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। জ্বালানি সংকট নিরসনে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে দেশের ৪৬টি কূপ অনুসন্ধান, খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা করেছে সরকার। ২০২৫ সালের মধ্যে এসব খনন কাজ শেষ হওয়ার কথা। পেট্রোবাংলার হিসাবে, খনন শেষ হলে এসব কূপ থেকে দৈনিক ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। যদিও এ পর্যন্ত ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ ও ২০২৩ সালের মধ্যে ২১টি কূপ খননের পরিকল্পনা করা ছিল। তবে পরিকল্পিত সময়ানুযায়ী কূপগুলো খনন করা যায়নি।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও জ¦ালানি তেলের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় সরকার আমদানিনির্ভরতা কমাতে অনুসন্ধানে তোড়জোড় শুরু করে। গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, সরকার অনুসন্ধান কার্যক্রম যত বাড়াচ্ছে, ততই সফলতা পাচ্ছে। ভোলায় গ্যাসের সন্ধান মিলেছে, মিলেছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের বিভিন্ন কূপেও।

পেট্রোবাংলার জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, দেশের ভয়াবহ গ্যাস সংকটে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোড়ালো করা হচ্ছে। নতুন নতুন কূপ খনন ও তেল গ্যাস অনুসন্ধানে গতি আনা হচ্ছে। গত তিন মাসে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের অধীনে তিনটি কূপ খনন করে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই তিনটি কূপই খনন করেছে সিলেট গ্যাস ফিল্ড। তিনি বলেন, সিলেট নিয়ে আরও সুখবর শিগগিরই আসবে। সেখানে নতুন আরেকটি কূপে গ্যাসের সন্ধান মেলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তেলের সন্ধানও মিলবে। তিনি বলেন, রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রের সামগ্রিক একটি রিপোর্ট প্রতিমন্ত্রী ও জ্বালানি সচিবের কাছে জমা দেওয়া আছে। আগামী মাসের প্রথমদিকে প্রতিমন্ত্রী সিলেট গ্যাস ফিল্ডে সফর করতে পারেন। তখন তিনি বিস্তারিত সুখবর জানাবেন।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে ব্যবহৃত মোট গ্যাসের ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় নিজস্ব গ্যাস ফিল্ড থেকে উত্তোলিত গ্যাসে। বাকি ২০ শতাংশ আমদানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা আমদানি বাড়াতে চাই না। ফলে নিজস্ব উৎস থেকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সর্বশেষ সিলেট গ্যাস ফিল্ডের রশিদপুরের ২নং কূপে গ্যাসের নতুন স্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। ২নং কূপে গ্যাসের অনুসন্ধানের খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি গত শনিবার রাতে তার ফেসবুক পেজে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন- সুখবর বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য, সিলেটের রশিদপুর ২নং গ্যাস কূপ অনুসন্ধানে নতুন গ্যাস স্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার পরিমাণ প্রায় ১৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বর্তমানে এর বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। আশা করছি, আগামী ১০ দিনের মধ্যে এখান থেকে দৈনিক ৮০ লাখ ঘনফুট হারে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে শেখ হাসিনা সরকারের অগ্রাধিকার আগামীতে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় সুসংবাদ বয়ে আনবে আশা করি।

এদিকে এ বিষয়ে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডের অধীনে নতুন নতুন কূপ খনন ও পুনঃখননের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে এখানে কূপ খনন করে সফলতা এসেছে। আশা করছি সামনের দিকে আরও সুখবর দিতে পারব। তিনি নতুন আরেকটি কূপে গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার আভাসও দেন। ইতোমধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডে তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

রশিদপুর ২নং গ্যাস কূপের আগে গত ২৬ নভেম্বর দেশের সবচেয়ে পুরনো গ্যাসক্ষেত্র হরিপুরের ১০ নম্বর কূপে গ্যাসের সন্ধান মেলে। খনন কাজ শেষে ওইদিন গ্যাস প্রাপ্তির তথ্য নিশ্চিত করে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস। গত বছরের জুনে এখানে খননকাজ শুরু হয়। ১৪৯ কোটি টাকায় কূপটি খনন করা হয়। এতে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কর্তৃপক্ষ। কূপটি থেকে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। এই কূপে মজুদ গ্যাসের মূল্য ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির যে দাম তাতে আমদানি মূল্যের হিসাব ধরলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এরও আগে, গত ২২ নভেম্বর সিলেটের কৈলাশটিলায় পরিত্যক্ত ২নং কূপ থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এখান থেকে দৈনিক ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে।

সিলেটের হরিপুরে প্রথম গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৫৫ সালে। এরপর আবিষ্কার হতে থাকে একের পর এক গ্যাসক্ষেত্র। বর্তমানে এসজিএফএলের আওতায় পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। সেগুলো হলো- হরিপুর গ্যাসফিল্ড, রশিদপুর গ্যাসফিল্ড, ছাতক গ্যাসফিল্ড, কৈলাশটিলা গ্যাসফিল্ড ও বিয়ানীবাজার গ্যাসফিল্ড। এর মধ্যে ছাতক গ্যাসফিল্ড পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। বাকিগুলোর মধ্যে ১৪টি কূপ থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১০৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডে মোট ১৪টি কূপ খনন ও পুনঃখনন করা হবে। এর মধ্যে তিনটির কাজ শেষ হয়েছে।

এদিকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাপেক্স মোট ২০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করলেও এ পর্যন্ত খনন করেছে ৫টি। এর মধ্যে ভোলায় তিনটি কূপ খননের কাজ করে বাপেক্স। প্রতিটিতেই গ্যাস পাওয়া গেছে। শরীয়তপুরে একটি কূপ খনন করে গ্যাস পাওয়া যায়নি। কুমিল্লার শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খনন করে গ্যাস পাওয়া গেলেও সেখান থেকে উত্তোলন বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে লাভজনক নয়। এ ছাড়া নোয়াখালীর সুন্দলপুরে একটি কূপ খননের কাজ আগামী মাসে শেষ হতে পারে। এরপর একই জেলার বেগমগঞ্জে একটি কূপ খননের কাজ শুরু হবে।

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ১২টি কূপ খনন করার কথা। এর মধ্যে একটির কাজ শেষ করেছে। এ কূপ থেকে গ্রিডে নতুন করে ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। আরেকটি কূপের সংস্কার কাজ এ মাসের শেষে শুরু হতে পারে। সংস্কারের তালিকায় থাকা ৮টি কূপের মধ্যে বাকি ৬টির ডিপিপি জ্বালানি বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *