সাভারে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা, একের পর এক লাশ

সাভারে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা, একের পর এক লাশ

তাজা খবর:

রাজধানীর সন্নিকটে সাভারে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। একের পর এক লাশ পড়ছে। কখনো বাড়িতেই মিলছে লাশ; কখনোবা ডেকে নিয়ে খুন করা হচ্ছে; আবার কখনো রাস্তার পাশে ঝোপঝাড়ে মিলছে নিষ্প্রাণ দেহ। লাশের পর লাশ পড়ছে আর স্বজনহারাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস।

সূত্রমতে, গত তিন মাসে সাভার ও আশুলিয়া থেকে উদ্ধার করা হয়েছে শতাধিক লাশ। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিনই অন্তত একটি করে লাশ পড়ছে। করোনার এই ক্রান্তিকালেও খুনের মতো অপরাধ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কায়-উদ্বেগে আছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা অবশ্য খুনখারাপি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ।

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম বলেন, সাভারে ৫০ লক্ষাধিক মানুষের বাস। লাশের সংখ্যার ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করা যাবে না। কারণ সাভারের তিন দিক দিয়ে মহানগরী ঢাকা। দুর্বৃত্তরা মহানগরে কিংবা আশপাশে হত্যা করেও লাশ ফেলে যাচ্ছে সাভার-আশুলিয়ায়। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক পারভিন ইসলাম বলেন, দিন দিন সাভার অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। আমরা মনে করি আইনের শাসন পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই জনগণ আতঙ্কিত অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

সাভারে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন খান (নঈম) বলেন, আমরা চাই সাভার হবে শান্তির জনপদ। কিন্তু সাভার থেকে প্রতিদিন গণমাধ্যমে লাশ উদ্ধারের সংবাদ আমাদের আতঙ্কিত করে তুলছে।

সর্বশেষ, মুক্তিপণ না পেয়ে আশুলিয়ায় সবুজ মিয়া নামে এক স্কুলছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা জাহিদুল ইসলাম নামে আরেক কিশোরকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকালে আশুলিয়ার মোজারমেইল এলাকার মহাসড়কের পাশের একটি ডোবা থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করেছে আশুলিয়া থানাপুলিশ। নিহত সবুজ লালমনিরহাট সদরের কাজী কলোনি গ্রামের মিছির আলীর ছেলে। সে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। জাহিদুলও একই গ্রামের বাসিন্দা। জানা গেছে, গত সোমবার রাতে সবুজ ও জাহিদুল গ্রামের বাড়ি থেকে রাগ করে পালিয়ে চলে আসে আশুলিয়ায় সবুজের বোনের বাড়ির উদ্দেশে। কিন্তু বাসা খুঁজে না পেয়ে তারা যখন বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিল, তখন একাধিক যুবক তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে বলে নির্জন স্থানে নিয়ে যায় এবং মারধর শুরু করে ওদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য। তাদের মারধরেই মারা যায় সবুজ।

অন্যদিকে একই রাতে পৃথক ঘটনায় সাভারের কর্ণপাড়ার একটি বাড়ি থেকে এক নারী এবং আমিনবাজারের একটি বাড়ি থেকে এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এর মাত্র দুদিন আগে অর্থাৎ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার পথে বখাটে মিজানের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে খুন হয় দশম শ্রেণির ছাত্রী নীলা রায় (১৪)। দীর্ঘদিন প্রেমের প্রস্তাবে সায় না দেওয়ায় নীলাকে খুন করে মিজান। সে একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনা করত। গত তিন দিনে এ হত্যা কাণ্ডের এজাহারভুক্ত আসামিদের কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। উল্টো হুমকি-ধমকিতে অসহায় আতঙ্কে আছে নীলাদের পরিবার। এমনকী মেয়েকে উত্ত্যক্তের ঘটনায় থানাতেও যাননি নীলার বাবা। তবে কি পুলিশের ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে নিহত নীলার বাবা নারায়ণ রায় লেন, পুলিশ নিয়ে যদি সমাজে ভয়ই থাকত, তা হলে বখাটেরা আমার মেয়েকে খুন করার সাহস পেত না। আর এভাবে একের পর এক লাশ পড়ত না।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে অবনতিশীল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিদিন যেভাবে সাভার-আশুলিয়া থেকে লাশ উদ্ধারের খবর যায়, তাতে মনে হয় গোটা এলাকা যেন এক মৃত্যুপুরী হয়ে গেছে। জনমনে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। মানুষ এসব কিছু মেনে নিয়েছে। কারণ তাদের মধ্যে এমন একটা ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, থানায় গেলে প্রতিকার পাওয়া যাবে না; বিচার পাওয়া যাবে না। আর এই একই কারণে সন্ত্রাসীরাও মারাত্মক বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাইদুর রহমান বলেন, এটি সত্য ঢাকা জেলা থেকে প্রতিদিন মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পাঠানো হয়। এটিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি বলা যাবে না। কারণ কেবল সড়ক দুর্ঘটনাতেই নয়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, আত্মহত্যা এমনকী বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোতেও লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।

আর যেসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার অধিকাংশ ইতোমধ্যে পুলিশ ডিটেক্ট করেছে। সুতরাং সাভার-আশুলিয়াতে লাশ পাওয়া গেলেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি এ কথা বলা যাবে না, যোগ করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *