সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে বাজার

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে বাজার

তাজা খবর:

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। এক বছরের ব্যবধানে পণ্যভেদে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণে সে হারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার। ব্যবসায়ীদের ডেকে এনে লম্বা বৈঠক করেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছে না। বরাবরের মতো দুর্বল বাজারে মনিটরিংয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে তদারকি সংস্থাগুলো। তবে আগামীকাল থেকে ট্রাকে করে ন্যায্যমূল্যে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য বিক্রি, চিনির দর বেঁধে দেওয়া, লুজ সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ ঘোষণাসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বরাবরের মতোই গতানুগতিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাজারে মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে সব ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদন অনুসারে, গত এক বছরের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের দাম কমেনি। বরং পণ্যভেদে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এর মধ্যে চাল মোটা কেজিতে বেড়েছে ৭.৫৬ শতাংশ, সয়াবিন তেল লিটারে ৩৮ শতাংশ, পাম ওয়েল লুজ লিটারে ৭০.৩৮ শতাংশ, পাম অয়েল সুপার লিটারে ৬১ শতাংশ, চিনি কেজিতে ২৬ শতাংশ, আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিতে ৩০ শতাংশ ও আমদানি করা রসুন কেজিতে বেড়েছে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পণ্যমূল্য কমাতে গত সপ্তাহে বৈঠকে বসলেও কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত আসেনি।

জানতে চাইলে গতকাল বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (আইআইটি) অনুবিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ভোক্তাকে প্রতারণা থেকে বাঁচাতে লুজ সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ হচ্ছে। সয়াবিন বিক্রি করতে হলে প্যাকেট বা বোতলজাত করে বিক্রি করতে হবে। কারণ পাম্প তেল সয়াবিন নামে বিক্রি হচ্ছে বলে আমাদের জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এছাড়া তেলের দাম সহসাই বাড়ছে না, জেনেভা সফররত বাণিজ্যমন্ত্রী ও সচিব ফিরে এলে তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘ভোজ্য তেলের মতোই চিনির দর বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। এখন থেকে চিনির দর বাড়াতে হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হবে।’ চালের দামের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে চাল আসতে শুরু করেছে। বাজারে এর প্রভাবও পড়ছে। এছাড়া কাল (৪ সেপ্টেম্বর) থেকে ট্রাকে করে দ্বিগুণ পরিসরে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি শুরু করবে টিসিবি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ পরিসর বাড়ানো হচ্ছে। আমরা টিসিবির জন্য পণ্য মজুদ ও সক্ষমতা বাড়িয়েছি। এবার ট্রাকে ৩০ টাকা দরে আমদানি করা পেঁয়াজও বিক্রি করবে টিসিবি।’

সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দর আরও প্রায় ১৫ টাকা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব ৫ আগস্ট জমা দেওয়া হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এ মাসে দাম বাড়ানো যাবে না। এজন্য তারা আগামী মাসের অপেক্ষায় রয়েছেন। তেমনি বিশ্ববাজারে চিনির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এর আগে বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেল ও চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একাধিক দফা চিঠি দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কর কমানোর অনুরোধ করেছিল। তবে কর কমেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম যেহেতু অনেক বেড়ে গেছে, তাতে তেল-চিনি থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। এক কেজি চিনিতে এখন কর দাঁড়াচ্ছে ২৮ টাকার মতো। সরকার এখন করে ছাড় দিলেও রাজস্ব আদায় আগের চেয়ে কমবে না।

তবে অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান এ বিষয়ে বলেছেন, ভোজ্য তেল ও চিনির আমদানি শুল্ক কমাতে এনবিআরকে দেওয়া চিঠির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তাগাদা দেওয়া হবে। আমরা অনুরোধ করতে পারি, বাধ্য করা সুযোগ নেই, বলেন তিনি।

নিত্যপণ্যের দামে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘এসব পদক্ষেপ গতানুগতিক। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিলে আর কমাতে চান না। এ ক্ষেত্রে দুটি কারণ রয়েছে, এক বাজার মনিটরিং নেই, দ্বিতীয় বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। মাঝেমধ্যে কিছু মোবাইল কোর্ট বের হয়। কিন্তু এটা বাজারে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘নিত্যপণ্যে দর নিয়ন্ত্রণে তদারকি জোরদার করার বিকল্প নেই। ব্যবসায়ীরা যেন বিভিন্ন পণ্য নিয়ে একচেটিয়া প্রভাব না ফেলতে পারে, সে ব্যবস্থাও নিতে হবে। নিজেদের সক্ষমতা থাকলে অসাধু চক্র সুযোগ নিতে পারবে না।’

মিরপুরে কালশি এলাকার রাকিব বলেন, ‘করোনার কারণে খুব একটা আয়-রোজগার বাড়ছে না। লকডাউনের সময় কাজ ছিল না, ঋণ করতে হয়েছে। এখন যা আয় হচ্ছে, তার বড় অংশ যাচ্ছে বাজার করে খেতেই। ঋণ পরিশোধ করব কীভাবে।’

রাজধানীর কারওয়ানবাজারে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে মিনিকেট ৫৮ থেকে ৬০, আটাশ ৪৭ থেকে ৫০, নাজির ৬২ থেকে ৬৮ ও স্বর্ণা ৪৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা বাজারে মিনিকেট ৬২ থেকে ৬৫, আটাশ ৫০ থেকে ৫৫, স্বর্ণা ৫০ ও নাজিরশাইল ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির তথ্যানুসারে, সরু চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। এক সপ্তাহ আগেও দাম একইরকম ছিল। এক মাস আগে দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। আর গত বছর এই দিনে এসব চালের দাম ছিল ৫৪ থেকে ৬৪ টাকা। সেই হিসাবে চালের দাম বাজারে এখনো ঊর্ধ্বমুখী এবং বছরে শতাংশিক হিসাবে দাম বেড়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ।

গতকাল মাঝারি মানের চাল ৫০ থেকে ৫৬ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। এক বছর আগে এ চালের দাম ছিল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। এসব চালের দাম বছরে বেড়েছে ৩ শতাংশ। এছাড়া বর্তমানে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে। এক বছর আগেও এসব চালের দাম ছিল ৪২ থেকে ৪৮ টাকা। সেই হিসাবে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ।

জানতে চাইলে কারওয়ানবাজারের মেসার্স রাব্বানীর স্বত্বাধিকারী আবদুল হালিম বলেন, ‘বাজারে চালের দাম কিছুটা কমেছে। বস্তায় ১০ থেকে ২০ টাকা। কিন্তু যেখানে বস্তায় দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা সেখানে ১০ থেকে ২০ টাকা কমানোকে কম বলে না। চালের বাজার এখনো চড়াই রয়েছে। বাইরে থেকে চাল আসবে এ প্রস্তাবনার পর মিলাররা দাম ১০ থেকে ২০ টাকা কমিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বাজারে আমদানি করা চাল না আসছে, কিংবা নতুন চাল না উঠছে, বাজার ততক্ষণ স্থিতিশীল হবে না।’

জানতে চাইলে নওগাঁ ধান-চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নিরোধ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘প্রতি বস্তাতেই চালের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কমেছে। আমাদের এখানে মিনিকেট এখন ২ হাজার ৫৫০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা বস্তায় বিক্রি হচ্ছে। আগে ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৮৫০ টাকা ছিল। নাজিরশাইল ২ হাজার ৮০০ টাকা বস্তাতে বিক্রি হচ্ছে, বস্তায় দাম ২০০ টাকা কমেছে। আটাশ এখন ২ হাজার ৪০০ টাকা বস্তায় বিক্রি হচ্ছে। সব চালের দামই বস্তায় ১০৯ থেকে ১৫০ টাকা কমেছে। সে ক্ষেত্রে কেজিতে কমেছে দাম ২ থেকে ৩ টাকা।’

সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক কমালেও বাজারে এখনো তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং চালের বাজার এখনো ঊর্ধ্বমুখীই রয়েছে। বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে চালের দাম কমেছে মিলাররা এমন দাবি করলেও খুচরা বাজারে দেখা গেছে, দাম আগের মতোই রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, মোটা চালের দাম কমেছে এবং শিগগিরই চালের বাজার স্থিতিশীল হবে। এর আগে সারা দেশে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখন ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে সিদ্ধ ও আতপ চাল আমদানি করা যাচ্ছে।

টিসিবির তথ্য অনুসারে, গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। এখন বাজারে এ তেল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৩০ টাকার। খোলা পাম তেলের দাম দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে লিটারে বিক্রি হচ্ছে ১১৪ থেকে ১১৬ টাকার মধ্যে। আর পাম সুগারের দাম গত এক সপ্তাহে বেড়েছে ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। এতে প্রতি লিটার সুগার পাম এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। আর সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা লিটার।

তেলের পাশাপাশি গত এক সপ্তাহে মশুর ডাল এবং দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। দেশি পেঁয়াজের দাম ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৪২ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৪০ দশমিক ৪৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে টিসিবি।

চিনির দাম গত এক সপ্তাহে বেড়েছে ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এতে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭৮ থেকে ৮০ টাকা। এর সঙ্গে বেড়েছে ডিমের দাম। এক সপ্তাহে ডিমের দাম ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি হালি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা।

দাম বাড়ার এ তালিকায় রয়েছে আমদানি করা শুকনা মরিচ, দেশি হলুদ এবং দেশি আদা। আমদানি করা শুকনা মরিচের দাম গত এক সপ্তাহে বেড়েছে ১৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এতে প্রতি কেজি আমদানি করা শুকনা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা।

আদা বিক্রি হচ্ছে আগের সপ্তাহের দামে। গতকালও ১২০ টাকায় বিক্রি হয় আদা। দেশি হলুদের দাম গেল এক সপ্তাহে ২৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বেড়ে কেজি ২১০ থেকে ২৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে টিসিবি। আর দেশি আদার দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এখন প্রতি কেজি দেশি আদা বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *