স্কুল যাচ্ছে বাড়ি বাড়ি

স্কুল যাচ্ছে বাড়ি বাড়ি

তাজা খবর:

ছোট্ট সিনথিয়ার জন্য আজকের সকালটা অন্যরকম। দীর্ঘদিন স্কুলের বারান্দায় ছোটাছুটি নেই, কারণ অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাস সেই সুযোগ আপাতত কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু আজ হঠাৎই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ধরা দিল সিনথিয়ার কাছে। ঘুমের আড়মোড়া ভেঙেই ছোট্ট মেয়েটি যেন ফিরে পেল তার স্কুল! বাড়িতে প্রিয় শিক্ষককে দেখে তার আনন্দ আর ধরে না। ম্যামকে জড়িয়ে ধরে, আদর করে। এতে আপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষকও। তারপর মেয়েটিকে নিয়ে পড়াতে বসেন।

শিশু সুমাইয়া জাহান সিনথিয়া গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাড়ারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। এই স্কুলের শিক্ষিকা রুনা আক্তার গত সোমবার সিনথিয়াকে পড়াতে তাদের বাড়িতে গেলে হৃদয়ছোঁয়া এমন ঘটনা ঘটে। পরে ঘণ্টাখানেক পড়িয়ে তিনি চলে যান। শুধু সিনথিয়া নয়, গাজীপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ূয়া এ রকম হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠদান করছেন শত শত শিক্ষক। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর গত বছরের মার্চ মাস থেকে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নানা মাধ্যমে পাঠদান চালু রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যেই অনাগ্রহী ভাব দেখা গেছে। অনেকে মাসের পর মাস বই নিয়েই বসেনি। মোবাইলে গেমস আর সঙ্গীদের সঙ্গে খেলাধুলা, হৈ-হুল্লোড় করে সময় পার করছে।

নতুন বছরের শুরুতে ছাত্রছাত্রীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার পর থেকে শ্রীপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পাঠ গ্রহণের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস। শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে না পারলে কী হবে, শিক্ষকরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়িয়ে আসছেন। শিক্ষার্থীদের অনুভূতি যেন তাদের কাছে শিক্ষক নয়, স্কুলই চলে আসছে।

মুলাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লুৎফর রহমান ফরহাদ বলেন, প্রতিদিন সকালে শিক্ষকরা স্কুলে এসে স্টাফ মিটিং শেষ করে বেরিয়ে যান শিক্ষার্থীর বাড়িতে। একজন শিক্ষক কমপক্ষে দু’জন শিক্ষার্থীর বাড়ি গিয়ে পাঠ দিচ্ছেন। কেউ কেউ ৮-১০ জনের বাড়িতেও যাচ্ছেন। সপ্তাহে অন্তত দু’দিন করে একজন শিক্ষক এক শিক্ষার্থীর বাড়ি গিয়ে পড়িয়ে আসছেন। বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক ব্লক আকারে ভাগ করে দিয়েছেন। একেক ব্লকে ৫০ জন শিক্ষার্থী। ওই ৫০ জনকে

বাড়িতে গিয়ে পড়িয়ে আসছেন একজন শিক্ষক।

উপজেলার ১৬৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ হাজার ১৭ জন শিক্ষক এভাবে পাঠ দিচ্ছেন

বলে জানায় প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। চলতি বছরের প্রথম দিক থেকে এ কার্যক্রম জোরালোভাবে শুরু হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে চলছে এ কার্যক্রম। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষক সন্ধ্যার পরও যাচ্ছেন শিক্ষার্থীর বাড়ি।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ কামরুল হাসান সমকালকে বলেন, বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই পাঠবিমুখ হয়ে পড়েছিল। শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠদান শুরু করায় আবার তাদের মধ্যে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রিয় শিক্ষককে কাছে পেয়ে তারা বেশ খুশি। অভিভাবকরাও এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। অভিভাবক স্বপ্না আক্তার বলেন, আরও আগে এ উদ্যোগ নিলে ভালো হতো।

ধনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, সহকারী শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। প্রধান শিক্ষক সেটা মনিটর করছেন।

গাড়ারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজেদা পারভীন বলেন, প্রতিদিন এসে আগের দিনের কার্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষককে অবহিত করছেন। লোহাগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান বলেন, শিক্ষকরাও বেশ আগ্রহ নিয়ে ছাত্রছাত্রীর বাড়ি গিয়ে পড়িয়ে আসছেন।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, সংশ্নিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশ পাওয়ার পরই উপজেলায় এ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ১৬৮টি স্কুলে ৪০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। স্কুল খোলার আগ পর্যন্ত এভাবে পাঠদান চলবে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন বলেন, শুধু শ্রীপুরে নয়, জেলার প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়েই এ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। কোনো কোনো বিদ্যালয় আরও আগেই শুরু করেছে। করোনার কারণে খানিকটা কমে যাওয়া পাঠাভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনতে এ কার্যক্রম ভূমিকা রাখবে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *