স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জন

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জন

তাজা খবর:

স্বাধীন হবার পর পর অনেক তীব্র সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। সে তার যাত্রা শুরু করেছিল, বলতে গেলে, শূন্য থেকে। তখন তাকে যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য দিয়েছিল বহু দেশ। কিন্তু তার অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাংলাদেশের নাম দিয়েছিলেন ‘তলা-বিহীন ঝুড়ি।’ তার ধারণা ছিল যে, যতোই সাহায্য করা হোক না কেন, বাংলাদেশ কখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু আজ বাংলাদেশকে দেখে সমগ্র বিশ্বই বিস্মিত হচ্ছে। উন্নয়নের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। সে ক্রমে উপরে উঠছে, আরও উপরে উঠছে। অজস্র তার অর্জন। আমরা কেবল কয়েকটা বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেবো।

ধরা যাক, কৃষির কথা। যে-বাংলাদেশ কয়েক বছর আগেও বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতো, সেই বাংলাদেশই এখন তার সতেরো কোটি লোকের জন্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন করছে। কেবল তাই নয়, সে তার উদ্বৃত্ত খাদ্য বিদেশে রপ্তানি করছে। অথচ কৃষি উৎপাদনের জন্যে তার জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম, মাথাপিছু মাত্র এক একরের চার ভাগের এক ভাগ। তাও প্রতি বছর কমে যাচ্ছে, শিল্প ইত্যাদি উন্নয়ন কাজে। শাক-সবজি, ফল-মূল এবং মাছ-মাংস ইত্যাদি সবকিছুর উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সত্যিকার সবুজ বিপ্লব যাকে বলে।

কেবল কৃষিতে নয়, বাংলাদেশ শিল্পের ক্ষেত্রেও অনেক এগিয়ে গেছে। স্বাধীনতা লাভের সময় বাংলাদেশে শিল্প বলতে ছিল কয়েকটি পাটের কল, একটি কাগজের কল আর কয়টি চিনির কারখানা। এখন ইস্পাত কারখানা-সহ নানা ধরনের শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। ওষুধের কারখানা, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটেছে। এমনি, বিকাশ ঘটছে সর্বত্র, সবকিছুতে।

একটা দেশের উন্নতি হয়েছে কিনা, অথবা উন্নতি হয়ে থাকলে কতোটা হয়েছে, তার পরিমাপ করা হয় সাধারণত অর্থনীতির মাপকাঠি দিয়ে। যেমন, দেশের প্রতিটি লোক বছরে গড়পড়তা কতো আয় করে। একে বলা হয় মাথাপিছু আয়। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো, তারপর প্রথম দিকে সেই মাথাপিছু আয় ছিলো ১৯৭২ সালে ৯৪ ডলার, আর ৭৪ সালে ১৮২ ডলার। বাংলাদেশ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব দশটা দেশের মধ্যে একটা। এখন সেই বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে– ২০১৯ সালে ১৮৫৬ ডলারে। বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হচ্ছে। তাছাড়া, করোনা-কালীন সংকট সত্ত্বেও এ বছরে শতকরা ৬ ভাগ প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নয়তো প্রবৃদ্ধির হার ছিলো শতকরা ৮ ভাগ অথবা তার চেয়েও বেশি। দেশের বিপুল জনসংখ্যা জনসম্পদে পরিণত হয়ছে। এখন দেশের প্রায় এক কোটি লোক বিদেশে গিয়ে সব ধরনের কাজ করছেন। তারা বিদেশ থেকে যে অর্থ পাঠাচ্ছেন, তার পরিমাণ প্রায় পোশাক শিল্প থেকে আয়ের মতো। শিশুমৃত্যুর সংখ্যা খুবই কমে গেছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নতির ফলে মানুষের আয়ু প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওদিকে, জন্মের হার অনেক কমে গেছে। পরিবারের আয়তন এখন তাই আগেকার তুলনায় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে অবিশ্বাস্যরূপে। ১৯৪০-এর দশকে গড়ে মাত্র পাঁচ হাজার মুসলমান প্রার্থী ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তখন ছিল সমগ্র বঙ্গদেশ ও আসাম। এখন কেবল বাংলাদেশ থেকেই পাঁচ লাখের বেশি ছাত্রছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার হার বিস্ময়কর মাত্রায় ‍বৃদ্ধি পেয়েছে। এ হার এখন শতকরা ৭১। এবং মেয়েরা কেবল প্রাথমিক/মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে খুশি নয়। হাজার হাজার নারী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে পঁচাশি হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী। তাদের শতকরা প্রায় ৪০জন ছাত্রী, ৬০জন ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

তাছাড়া, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নারীদের উন্নতির কথা বিচার করলে দেখা যায় যে, তাদের অবিশ্বাস্য অগ্রগতি হয়েছে। পঞ্চাশ বছর আগে যে-নারীরা সাধারণত চার দেয়ালের মধ্যেই বন্দী থাকতেন এবং ঘরের কাজ আর সন্তান লালন ছাড়া আর-কিছু করতেন না, সেই নারীরা এখন এমন কোনো কাজ নেই, যা করছেন না। কৃষির কাজ থেকে আরম্ভ করে বিমান চালানো পর্যন্ত সকল কাজেই নারীরা অংশগ্রহণ করছেন।

একটা সময়ে নারীদের পক্ষে শিক্ষকতা, ডাক্তারি, নার্সিং ইত্যাদি কয়েকটা কাজ ছাড়া, অন্য কোনো কাজ করা সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। অপর পক্ষে, এখন এমন কোনো পেশা নেই, যাতে নারীরা যোগ দিচ্ছেন না। যেসব কাজে শারীরিক শক্তি লাগে, সেসব কাজ নারীরা আগে করতেন না। কিন্তু এখন অনেকেই করছেন। যেমন, সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন, পুলিশবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ চিত্র দেখতে পাই পোশাক শিল্পে। ৪০ লাখ পোশাক শিল্পের কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৩২ লাখই নারী। তার থেকেও বেশি নারী ল্প্তি আছেন কৃষি এবং অন্যান্য অর্থকরী কাজে। নারীরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।

শিক্ষা এবং কর্মজীবনে এই ব্যাপক উন্নতির ফলে নারীরা এখন আগের তুলনায় পরিবার এবং সমাজে অনেকটাই ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আরম্ভ করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে নির্বাচনের মাধ্যমে তারা দেশ পরিচালনায় অংশ নিচ্ছেন। এমন কি, দেশের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন একাধিক নারী। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল প্রতীকী প্রধানমন্ত্রী নন, বরং তিনি দেশকে পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি আরও প্রমাণ করেছেন যে, তিনি একজন অভিজ্ঞ এবং বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতিবিদ। তার পরিচালনায় বাংলাদেশ উন্নতির রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। তিনি অধীনতামূলক এবং অসম্মানজনক শর্ত মেনে নিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করাননি। বরং নিজেদের অর্থে নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। ঢাকার মেট্রোরেল-সহ যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপুল উন্নতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যাপক বিদ্যুতায়ন সবই বাংলাদেশের দৃষ্টান্তমূলক উন্নতির প্রতীক।

সরকারী কর্মকাণ্ডের সকল স্তরেও নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন। নারীদের এই ক্ষমতায়নের ফলে পরিবার, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রে তারা আর নীরব থাকছেন না, বরং তারা সরব হয়ে উঠেছেন। আগে পরিবারে এবং সমাজে সিদ্ধান্ত নিতেন পুরুষরা। এমন কি, সন্তান নেওয়া হবে কিনা, তাও ঠিক করতেন স্বামীরা। কিন্তু এখন কেবল পারিবারিক সিদ্ধান্তই নয়, সব রকমের সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নারীরাও অংশ নিচ্ছেন।

মোট কথা, বিশাল জনসংখ্যার চাপ, প্রতিকূল প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক হানাহানি ইত্যাদি সত্ত্বেও বাংলাদেশ পঞ্চাশ বছরে উন্নতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *