হালদার মাছের জীবন রহস্য উন্মোচন

হালদার মাছের জীবন রহস্য উন্মোচন

তাজা খবর:

দেশে প্রথমবারের মতো হালদা নদীর চারটি কার্প জাতীয় মাছ রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ এবং ডলফিনের পূর্ণাঙ্গ জীবন রহস্য উন্মোচন বা জিনোম সিকোয়েন্সিং করেছেন গবেষকেরা। এর ফলে এই মাছগুলোর অভিযোজন এবং এগুলোর জাত উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণা সহজ হবে।

মঙ্গলবার এই তথ্য জানিয়েছেন গবেষণা কাজের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়ার তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত এ গবেষণায় বিভাগের শিক্ষার্থী সুমা আক্তার, নাজনীন ইসলাম, সাবিহা মুস্তফা অর্পা, আবদুল্লাহ আল আশেক এবং আজলিনা কবির অংশ নেন। গবেষণায় কারিগরি সহায়তা দেন চট্টগ্রাম ভ্যাটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এম এ এম জুনায়েদ সিদ্দিকী।

ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া নিউজবাংলাকে জানান, পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিন্যাস উদঘাটনের জন্য দুই বছর আগে হালদা রিসার্চ ল্যাব একটি গবেষণা প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়। পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে আইএফডি-এর সহযোগিতায় সম্পন্ন এ প্রকল্পে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে সম্প্রতি হালদা নদীর রুই জাতীয় মাছ এবং ডলফিনে পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিন্যাস উদঘাটন করা হয়।

তিনি জানান, প্রাকৃতিক ও চাষযোগ্য উভয় ধরনের মাছের গুণগত মান সংরক্ষণের জন্য জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রজাতিগুলোর গুণগত উচ্চমানের জেনেটিক তথ্যের সাথে অন্যান্য প্রজাতির জিন তথ্যের তুলনামূলক গবেষণা মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে মাছগুলোর অভিযোজন প্রক্রিয়া এবং হালদা নদীর প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যের উপযোগিতা সম্পর্কে গবেষণা সম্ভবপর হবে।

ড. কিবরিযা বলেন, ‘সম্প্রতি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অত্যাধুনিক পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিন্যাস একটি খুবই কার্যকর পদ্ধতি। এর ফলে মাছের শরীরবৃত্তীয় গবেষণা সম্ভব হচ্ছে। কার্প জাতীয় মাছ যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও হ্যাচারিতে বড় হওয়া মাছের জেনেটিক পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন তুলনামূলক গবেষণার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইতোপূর্বে বন্য পরিবেশে বড় হওয়া রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশের কোনো পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিন্যাস করা হয়নি। তাই আমাদের এই গবেষণা হ্যাচারি ও বন্য পরিবেশে বড় হওয়া এ প্রজাতিগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইনব্রিডিং সমস্যাসহ পরিবেশগত পরিবর্তন, অসুস্থতা, রোগের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে।’

প্রায় ৫০ বছর আগে এ নদী থেকে ৪০-৫০ হাজার কেজি করে মেজর কার্প প্রজাতিসমূহের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা গেলেও বর্তমানে এর পরিমাণ কমে এসেছে অনেকখানি। প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে এ নদীর পরিবেশ ক্রমশ মা মাছের ডিম ছাড়ার অনুপযোক্ত হয়ে পড়েছে। দুষণ, শাখা নদীসমূহে স্লুইস গেইট ও রাবার ড্যাম নির্মাণ এবং মা মাছ শিকারের ফলে এ নদীর মাছের পরিমাণ দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে।

অপরদিকে, দেশে একুয়াকালচারের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে মাছের রেণুর চাহিদাও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এ মাছের জিনগত বৈচিত্র্য নির্ধারণের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ ইতোপূর্বে নেয়া হয়নি। প্রাকৃতিক পরিবেশে এ ইন্ডিয়ান মেজর কার্প সংরক্ষণের জন্য এদের জিনগত গঠন এবং বৈচিত্র্য জানা জরুরি। তা ছাড়া, এ প্রকল্পের মাধ্যমে হালদা নদীর কার্পসমূহের ব্র্যান্ডিং সুনিশ্চিত হবে, যা বাণিজ্যিকীকরণ ও উদ্যোক্তা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো টিকে থাকার জন্য নানাভাবে অভিযোজিত হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে শুশুক বা ডলফিনের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক শুশুক প্রতিনিয়ত মাছধরার জালে আটকা পড়ছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী এই প্রজাতিটি সংরক্ষিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন পানিদূষণ, নদীতে অতিরিক্ত নৌ চলাচল, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ হ্রাস এবং বাসস্থানের ক্ষয়ক্ষতিসহ বিভিন্ন কারণে এ প্রজাতিটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। সে কারণে শুশুকের এ প্রজাতিটিকে বিপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জিনোম বিন্যাসের ফলে গাঙ্গেয় ডলফিনের জিনের প্রোটিনের কার্যকারিতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখন জানতে পারবেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিন্যাস উন্মোচনের ফলে ইন্ডিয়ান মেজর কার্পসমূহ ও ডলফিনের জিনের বিন্যাস, বিবর্তনের গতিপথ, জিনের সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি বংশগত বিস্তৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। একই সাথে অভিযোজন এবং বিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ জিন সনাক্তকরণে এ গবেষণাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রকল্পের তথ্য এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এ মাছগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশে রোগ প্রতিরোধ, সুব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষণ করা সম্ভবপর হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *