নদী দখলদারের তালিকা

হালনাগাদ হবে নদী দখলদারের তালিকা

তাজা খবর:

সারা দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা চলতি বছরের মধ্যে হালনাগাদ করবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। একই সঙ্গে দেশের নদ-নদী এবং খালের সংখ্যা ও নামের তালিকাও হালনাগাদ করা হবে। বালুমহাল ও জলমহালের ডাটাবেজ আপগ্রেড করবে। নদীদূষণ পয়েন্ট ও দূষণকারীদের নতুন তালিকা করার পরিকল্পনা রয়েছে নদী রক্ষা কমিশনের। সম্প্রতি নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘উন্নয়ন পরিকল্পনা সংক্রান্ত এক বিশেষ সভা’য় এক বছরের কর্মপরিকল্পনায় এ তথ্য তুলে ধরেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। ওই সভায় নদী রক্ষা কমিশনসহ নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ১৭টি দপ্তর ও সংস্থা এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি পৃথক কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করে।

ওই সভায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বছরের কর্মপরিকল্পনায় ১০০ মিলিয়ন টন কার্গো ও ৩ মিলিয়ন টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করার কথা জানিয়েছে। চলতি বছরে মোট তিন হাজার ৭২৫টি জাহাজ হ্যান্ডেলিংয়ের কথা রয়েছে। মোংলা ও পায়রা বন্দরও তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ভোমরা স্থলবন্দরের অপারেশন কার্যক্রম পুরোপুরি ডিজিটাল পদ্ধতিতে শুরু করবে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। বেনাপোল স্থলবন্দরে কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনাল চালু হবে। এ বছর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ৯০ কিলোমিটার নৌপথ উদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ’র। নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। আর বিআইডব্লিউটিসির এক বছরের কর্মপরিকল্পনায় সংস্থার ব্যয় কমিয়ে আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সভায় নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প না নিতে সংস্থাগুলোর প্রধানদের নির্দেশ দেন। চলমান প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কর্মসংস্থান তৈরি হয়, এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের ২৩ জানুয়ারির এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। নৌমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দ্বিতীয় মেয়াদে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এতে দপ্তর ও সংস্থাপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় শিমুলিয়া ও চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরে পর্যায়ক্রমে জাদুঘর নির্মাণে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। প্রসঙ্গত, দেশের সব নৌবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দর এ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।

সভার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তফা কামাল শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, মূলত এক বছর ও পাঁচ বছরে দপ্তর ও সংস্থাগুলো কখন কী কাজ করবে তার কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন দপ্তর ও সংস্থার প্রধানরা। আর মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন করা। তিনি বলেন, ওই সভায় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প না নেওয়া, সরকারের খরচ কমানো, দ্রুত প্রকল্প শেষ করা, কর্মসংস্থান তৈরিতে অগ্রাধিকার দেওয়াসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুশাসন বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

নদী রক্ষা কমিশন : জানা গেছে, সভায় চলতি ২০২৪ সালে ১২টি কার্যক্রম বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন নদী রক্ষা কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামরুন নাহার আহমেদ। কর্মপরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে-অবৈধ দখলদারদের সংখ্যা ও উচ্ছেদের তালিকা, নদ-নদীর নাম ও সংখ্যা, সব খালের নাম ও সংখ্যা, দূষণ পয়েন্ট ও দূষণকারীদের তালিকা এবং বালুমহাল ও জলমহাল সংক্রান্ত তালিকার ডাটাবেজ হালনাগাদ করা হবে। নদী রক্ষা কমিটির সহযোগিতায় সারা দেশে গণসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে দেশে প্রথমবারের মতো এক হাজার ৮টি নদ-নদীর নাম প্রকাশ করে নদী রক্ষা কমিশন। এর আগে ২০২১ সালে ৬৩ হাজার ২৪৯ জন নদী দখলদারের তালিকা প্রকাশ করে। এবার নদী দখলদার, দূষণকারীসহ অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করে তা প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে নদী রক্ষা কমিশনের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান কামরুন নাহার আহমেদ গতকাল যুগান্তরকে বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে নদী দখল ও দূষণকারীদের নামের তালিকা রয়েছে। ওই তালিকার বাইরেও ডিসি ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে দখলদারদের নামের তালিকা পাচ্ছি। ডিসেম্বরের মধ্যে এই তালিকা হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে ৫৯টি জেলার খালের তালিকা দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। বাকি জেলাগুলোর তালিকাও নেব। এসব কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। শুধু তালিকা করলেই হবে না, উচ্ছেদ করতে হবে বলে মনে করেন নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ। তিনি বলেন, নদী দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ তালিকা তৈরি করে খুব একটা লাভ হবে না। তিনি বলেন, ডিসিদের তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা হালনাগাদ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ওই তালিকা ত্রুটিপূর্ণ থাকে। আমরা স্যাটেলাইটভিত্তিক তালিকা তৈরির পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, যা আলোর মুখ দেখেনি। নদী দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

চট্টগ্রাম বন্দর : জানা গেছে, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে এক বছর ও পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। চলতি বছরে বে-টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় ট্রাক টার্মিনাল, ডেলিভারি ইয়ার্ড ও পতেঙ্গায় কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ শেষ করবে এ সংস্থা। প্রতিটি গেট ও প্রবেশপথে স্মার্ট একসেস সিস্টেম স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের। সভায় চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাদুঘর নির্মাণের জন্য বলা হয়েছে।

পায়রা বন্দর : চলতি বছরে ৬৫০ মিটার জেটি নির্মাণ ও তিন লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটারের ইয়ার্ড নির্মাণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে পায়রা বন্দর। এছাড়া চলতি বছরে পায়রা বন্দরে জাহাজ প্রবেশের জন্য ১০ দশমিক ৫ মিটার গভীরতা সংরক্ষণ কার্যক্রম এবং ১৫ মিলিয়ন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের।

স্থলবন্দর : চলতি বছরে রামগড়, শেওলা ও ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বেনাপোল স্থলবন্দরে কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করে সেটি চালু করবে এ সংস্থাটি। এছাড়া সমন্বিত অটোমেশন পদ্ধতি চালু করার পদক্ষেপও বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ।

বিআইডব্লিউটিএ : চলতি অর্থবছরে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ৯০ কিলোমিটার নৌপথ পুনরুদ্ধার, ঢাকার চারপাশে ১৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ২টি জেটি ও ১২টি আরসিসি সিঁড়ি নির্মাণসহ বেশ কিছু কার্যক্রমের কর্মপরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। অন্যান্য কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে নৌযান চলাচলে অনলাইন পদ্ধতি চালুর পাইলটিং কার্যক্রম গ্রহণ এবং নদীর গভীরতা অনুযায়ী নৌপথের পুনর্বিন্যাস কার্যক্রম চালাবে সংস্থাটি। অন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে বিআইডব্লিউটিসি নিজস্ব আয় বাড়াতে অলস জাহাজ ভাড়া দেওয়া, নিজস্ব ডকইয়ার্ডে নৌযান মেরামত করাসহ বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। আর চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি জানিয়েছে, চলতি বছরে এক হাজার ৮৫০ ক্যাডেটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শেষ করবে। ন্যূনতম ৬টি আন্তর্জাতিক বিদেশি শিপিং কোম্পানিতে বাংলাদেশি মেরিনারদের কর্মসংস্থান তৈরিতে পদক্ষেপ নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *