২৫ শতাংশ জনবলেই কাজ হোক সর্বত্র

২৫ শতাংশ জনবলেই কাজ হোক সর্বত্র

তাজা খবর:

করোনা পরিস্থিতিতে সচিবালয়ে প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অফিসে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরও ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী অনলাইনে কাজে যুক্ত থাকবেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে অফিসের কাজকর্ম চলবে। এর বাইরে অন্যান্য অফিসগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের গৃহীত এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সেইসঙ্গে তারা সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই একই নির্দেশনা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের অভিমত, করোনা সংক্রমণের পিকটাইমে কার্যকর লকডাউন প্রয়োজন ছিল এবং সেটিই বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে সরকার লকডাউন তুলে নিয়ে অফিস-আদালত খুলে দিয়েছে। এতে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত দু’দিনে সংক্রমণের মাত্রাও বেড়েছে। এ অবস্থায় সরকারের কম জনবল নিয়ে অফিস করার নির্দেশনা কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। তবে শুধু সচিবালয়ের অভ্যন্তরে নয়, সর্বত্রই এ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি কিছুটা হলেও সুরক্ষিত থাকবে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমও চলবে।

আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সমকালকে বলেন, সমস্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়কে সুরক্ষিত রাখতে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে।

রোববার অফিস চালুর পর বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছিলাম। সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবসহ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আমরাও জনপ্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়টি অবহিত করেছি। কে কীভাবে কাজ করবে সে অনুযায়ী তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। আপাতত সচিবালয়ের জন্যই এটি কার্যকর হবে। অন্যান্য সরকারি অফিসগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল নিয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, করোনার সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা আক্রান্ত হলে পরে সরকারি কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় ভিড় সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করুক- এটি আমরা চাই না। কমসংখ্যক জনবল অফিসে উপস্থিত হলে নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সমস্ত কার্যক্রম চালালে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে আনা যাবে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই মূলত আদেশটি দেওয়া হয়েছে।

সচিবালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্যও এ আদেশ জারি করা হবে কিনা- এমন প্রশ্নে ফরহাদ হোসেন বলেন, আমরা আগেই বলেছি, মন্ত্রণালয় ও অফিসগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমিত আকারে অফিস চালাবে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা কম। তারা বেশিরভাগই একটি কম্পাউন্ডে কাছাকাছি বসবাসও করেন। মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে সচিবালয়ের মতো ভিড় হয় না। সুতরাং তাদের জন্য আপাতত এই নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। এ অবস্থায় সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, আগের প্রজ্ঞাপনে শর্তসাপেক্ষে সীমিত আকারে সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি অফিসগুলো নিজস্ব ব্যবস্থায় খোলা থাকবে বলে জানানো হয়েছিল। প্রসূতি, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিকে কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে বলা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করাই সবার লক্ষ্য। সরকারের পাশাপাশি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সংক্রামক এই ভাইরাসটি প্রতিরোধের মূল উপায় হলো- নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এখন অফিসে সব জনবল একসঙ্গে বসে কাজ করতে গেলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে বাসা থেকে অফিসে যাতায়াতের সময়ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন হবে। কমসংখ্যক জনবল নিয়ে অফিসে কাজ করলে রাস্তাঘাটে মানুষের ভিড় কম হবে। অফিসেও নিরাপদ দূরত্ব মেনে চলা সহজ হবে। এই প্রক্রিয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকিও কমবে। আশা করি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এটি অনুসরণ করবে। প্রয়োজন হলে পরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা আদেশের বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হবে বলে জানান তিনি।

সিদ্ধান্ত ইতিবাচক, প্রজ্ঞাপন প্রয়োজন- মত সাবেক সচিবদের : করোনা সংক্রমণ এড়াতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বলে মত দিয়েছেন সাবেক সচিবসহ সরকারি কর্মকর্তারা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক দূরত্ব অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এরপরও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে যুক্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সুতরাং সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতিতে কাজ চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে চালু করা প্রয়োজন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এ নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। মৌখিক নির্দেশনার পরিবর্তে সার্কুলার জারি করলে আরও ভালো হবে বলে মনে করেন তিনি।

প্রায় একই মত দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। সমকালকে তিনি বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এ জন্য একটি সার্কুলার জারি করা প্রয়োজন। সার্কুলারের মাধ্যমে কার্যপরিধি সম্পর্কে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিস্কার একটি ধারণা দিতে হবে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন কাজগুলো করবে আর কী কী করবে না- সে বিষয়ে সবার স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনলাইনে যারা অফিসের কাজ করবেন, তাদের উপস্থিতি ও কাজের বিষয়গুলো কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তাও পরিস্কার করতে হবে।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন সচিব ইউসুফ হারুন সমকালকে বলেন, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো রোস্টার তৈরি করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের সমন্বয় করবেন। সে অনুযায়ী কে কখন দায়িত্ব পালন করবেন তা বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সবাই এ আদেশ অনুসরণ করবেন বলে জানান তিনি।

সর্বত্রই একই ব্যবস্থাপনা চান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা : শুধু সচিবালয়ে নয়, সবক্ষেত্রের জন্য এ আদেশ জারি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন করোনা প্রতিরোধে গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা। তিনি সমকালকে বলেন, বর্তমানে দেশে করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণ চলছে। এই সময়ে কার্যকর লকডাউন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অর্থনীতিসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে সরকারকে অফিস-আদালত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। করোনার মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ পরস্পরের সংস্পর্শে মানুষ যত বেশি যাবেন, তত বেশি এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অফিস-আদালত চালুর পর রাস্তাঘাট ও অফিস প্রাঙ্গণে মানুষের সহাবস্থান বাড়বে। তখন সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এতে করে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে, যা আমাদের সবার জন্য ভয়ংকর হয়ে দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় অফিস উপস্থিতির বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ইতিবাচক। এখন এটি পুরোপুরি কার্যকর করা প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ আদেশের আওতায় আনা দরকার। অন্যথায় এ উদ্যোগ কার্যকর ফল দেবে না।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, শুধু সচিবালয়ে ২৫ শতাংশ জনবলের উপস্থিতি রেখে কাজ করার আদেশ করা হয়েছে। অন্যান্য অফিস-আদালতের ক্ষেত্রে কোনো নির্দেশনা নেই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে শুধু সচিবালয় মুক্ত থাকলে সারাদেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে- বিষয়টি তো এমন নয়। সমস্ত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্যই এ আদেশ প্রয়োজন। এতে করে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত কমিটির প্রধান সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন সমকালকে বলেন, অফিস-আদালত সবকিছু খুলে দেওয়া ছাড়া আমাদের হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। জীবন-জীবিকার সমন্বয়ের তাগিদে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সে অবস্থা থেকে জনসাধারণকে কিছুটা ঝুঁকিমুক্ত রাখতে আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা হয়তো আরও কিছুদিন পর বোঝা যাবে। তবে এটি শুধু সচিবালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে চালু করা যেতে পারে। এতে করে রাস্তাঘাটে জটলা কম হবে। পরিবহনেও ভিড় কমে আসবে। অফিস-আদালতে নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে চললে ঝুঁকি কিছুটা এড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *