৪৯ হাজার কোটি টাকার জট খুলতে এনবিআরের উদ্যোগ

৪৯ হাজার কোটি টাকার জট খুলতে এনবিআরের উদ্যোগ

তাজা খবর:

উচ্চ আদালত ও রাজস্বসংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালগুলোয় ঝুলে থাকা ৩২ হাজার ২৫৪ রাজস্বসংক্রান্ত মামলায় আটকে থাকা ৪৯ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকার জট খুলতে উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ জন্য প্রতিটি কর অঞ্চলের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাকে সক্রিয় করতে আটটি দায়িত্ব দিয়ে আদেশ জারি করেছে এনবিআর। গত ১ আগস্ট জারি করা এ সংক্রান্ত আদেশ দেশের সব কর অফিসে পাঠানো হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এনবিআর সদস্য (ট্যাকসেস লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে- উচ্চ আদালতে বিচারাধীন নিজ নিজ কর অঞ্চলের কর মামলাগুলোর হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করে এনবিআরকে জানাতে হবে। মামলাগুলোর শ্রেণিবিন্যাস করে আলাদা তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। আদালতে প্রতিদিনের অনলাইন কার্যতালিকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিজ নিজ কর অঞ্চলের মামলার শুনানির তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। শুনানির জন্য নির্ধারিত রিট/রেফারেন্স মামলার প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর অঞ্চলের দফাওয়ারি জবাব প্রস্তুত করে আদালতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। মামলার শুনানিকালে ডেপুটি/সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের আইনগত সহযোগিতার জন্য শুনানিকালে আদালতে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। মামলার রায়পরবর্তী আদেশের কপি সংগ্রহ করে তা বাস্তবায়ন এবং আদেশের

বিপরীতে আইনগত করণীয় সম্পর্কে কর কমিশনার কার্যালয়ের মতামত/প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদন এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সদস্যের কাছে পাঠানো নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (ট্যাকসেস লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মাহবুব হোসেন গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি এতে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

এনবিআর ও আদালতসূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জানা যায়, সারাদেশে রাজস্বসংক্রান্ত ৩২ হাজার ২৫৪ মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার বিপরীতে সরকারের রাজস্বজড়িত ৪৯ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। আপিল বিভাগে ৬৯১ আপিলে রাজস্বজড়িত রয়েছে ৪ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা; হাইকোর্টে ৫ হাজার ৩৪৭টি রিটের বিপরীতে জড়িত ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং হাইকোর্টে ট্যাক্স ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে দুই হাজার ৭৮৮ আপিলের বিপরীতে জড়িত তিন হাজার ২৩২ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। আপিল কমিশন ও ট্রাইব্যুনালের ২৩ হাজার ৭২৮ মামলার বিপরীতে আটক ২৫ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা; কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল কমিশনে ১২ হাজার ৬১৩ মামলার বিপরীতে ১০ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা; কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনাল মামলা ১০ হাজার ৩০৫ মামলায় ৮ হাজার ৬১২ কোটি টাকার রাজস্বজড়িত রয়েছে। এ ছাড়া আয়করসংক্রান্ত ৫১০ মামলার আটকে রয়েছে ৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া ব্যবসায়ীরা এসব মামলা দীর্ঘমেয়াদি করতে নানাভাবে তৎপর। এই তৎপরতা ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, কিছু দিন আগে এনবিআর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) মাধ্যমে রাজস্বসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিলেও তা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এখন সরকার এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের ওপর চাপ প্রয়োগ ছাড়া কোনো পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিচার বিভাগের চলমান দীর্ঘসূত্রতা কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে রেখেছে স্বার্থানে¦ষী মহল। তারা মামলাকে রাজস্ব আটকানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা বলেন, বর্তমানে রাজস্বসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে একাধিক বেঞ্চ নির্ধারিত থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বেঞ্চ বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব মামলা নিষ্পত্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে বলেও তাদের মতো।

জানা গেছে, রাজস্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে করদাতা কিংবা ব্যবসায়ীরা চাইলে আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। বিভিন্ন সময় এমন বিরোধে করদাতারা আদালতে গেছেন। তবে সম্প্রতি এ প্রবণতা বেড়েছে। যে হারে রাজস্বসংক্রান্ত মামলা হচ্ছে নিষ্পত্তির হার সে তুলনায় ধীরগতি হওয়ায় দিন দিন মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ভ্যাট-ট্যাক্সসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে যেমন ব্যবসায়ীরা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন, একইভাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীরাও আদালতে মামলা করে আটকে রাখছেন হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব।

উচ্চ আদালতে রাজস্বসংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য এনবিআরের নিজস্ব রিটেইনার রয়েছে। তারা মূলত মামলা পরিচালনায় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়কে সহায়তা করেন। এ ক্ষেত্রে এনবিআর ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য একজন সমন্বয়ক কর্মকর্তা পদায়ন করে এনবিআর। তবে এ পদে পদায়ন করা হয় এক থেকে দুই মাসের জন্য। ঘন ঘন সমন্বয়ক কর্মকর্তা পরিবর্তনের কারণে বেগ পেতে হয় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের। দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে মামলাগুলো।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ আব্দুল মজিদ আমাদের সময়কে বলেন, যে কোনো মামলায় আদালতে সঠিকভাবে কাগজপত্র ও দলিলাদি উপস্থাপন করতে না পারলে আদালত রায় দিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এ ছাড়া মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উভয়পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। উদ্যোগে ঘাটতি থাকা যাবে না। যেহেতু এনবিআরের মামলায় আর্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকে, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবিত করার চেষ্টা থাকে। এ জন্য আদালতকে সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *